Monday, August 10, 2009

অন্তর্গত

কে কোথায় নিভে গেছে তার গুপ্ত কাহিনী জানি।
নিজের অন্তর দেখি, কবিতার কোন পঙতি আর
মনে নেই গোধূলিতে; ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই।
অথবা গৃহের থেকে ভুলে বহির্গত কোনো শিশু
হারিয়ে গেছে পথে, জানেনা সে নিজের ঠিকানা
[সন্তপ্ত কুসুম ফোটেঃ বিনয় মজুমদার]


(উৎসর্গঃ- প্রিয় শিমুল, আনোয়ার সাদাত শিমুল'কে- যে একদিন বড় হয়ে, আরো বড় গল্পকার হবে)




১.
ঘুমের ভেতর অসুখের ঘ্রান পায় হাসান অথবা অসুখের ঘ্রানে ঘুম ভাঙ্গে। ঘুম ভাঙ্গে কিন্ত চোখ খুলতে পারেনা, চোখ খুলে তাকাতে পারেনা। যেনো চোখের ভেতরে মুঠো মুঠো বালি ঠেসে দেয়া। কড়কড়ে অস্বস্তি।
দু হাত উপরে চেপে ধরে ধীরে ধীরে খুলতে গিয়ে যেনো সে ঝলসে যায়, চোখের উপর হাজার ওয়াটের বাতি জ্বলছে। আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে দৃষ্টি গেঁথে যায় অনেক উঁচুতে জানালার গরাদে। গরাদ ঠেলে রোদ আসছে অথচ বাতাস নেই। ফুসফুসে হাসফাস।
এই কারাগার থেকে সহসা মুক্তি নেই, জেনে তবু কি এক অবোধ্য তাড়নায় সে লাফিয়ে উঠে গরাদ ভাঙবে বলে।
ঘোর। ঘোর কাটলে পরে হাসান টের পায় এটি তার ব্যক্তিগত শোবার ঘর মাত্র। গত রাতে বাতি নেভানো হয়নি। জানালার পর্দা ও টানা হয়নি। বেলা অনেক। বাইরের কড়া রোদ ঘরের ভেতর।

২.
বাচ্চাদের স্কুলের সকালের শিফট শেষ হবার আগে আগে রাস্তার উল্টোপাশে এসে দাঁড়ায় হাসান।
পাড়ার ময়লা নিয়ে যাচ্ছে একটা ভ্যান। ভ্যানের পেছন থেকে ময়লা গড়িয়ে পড়ছে রাস্তায়। মাইকে প্রবল চিৎকার। মানুষের অহেতুক ছুটোছুটি। স্কুলের গেটে এসে ভীড় করছে অভিভাবকরা। হাসানের কোন তাড়া নেই। অফিস ছুটি সপ্তাহখানেকের। কোথাও তেমন যাওয়ার নেই।
বাচ্চারা সব বের হয়ে আসার পর একজন দুজন করে মিস্ট্রেস ও বের হতে থাকে। একেবারে পেছনে চৈতী। হাসান রাস্তা পেরোয়। চৈতী হাত নাড়ে। কলাপাতা রংয়ের জামা, চুল বেনী করা- ওকে বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেনী বলে ভ্রম হয়।
চোখমুখে রোদ ঝলমল আলো ফুটিয়ে ও এসে হাসানের বাহু স্পর্শ করে।-‘ চলো আইসক্রীম খাবো’
কিছুটা দূর হেঁটে ওরা আইস ক্রীম পার্লারে ঢুকে। ফালুদার গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে চৈতী বলে- তোমার তো ছুটি, চলো কাল কোথাও বেড়াতে যাই সারাদিনের জন্য। আমি ছুটি নিতে পারবো।

আইস ক্রীম পার্লারের ঠান্ডায় হাসানের ঘুম পায়। থুতনীতে হাত ঠেকিয়ে বলে-কোথায় বেড়াতে যাবে? এই শহরে নিঃশ্বাস নেয়ার মতো কোন জায়গা খুঁজে পাইনা আমি

চৈতী জানায় শহরের ঠিক অদূরেই নাকি একটা বিনোদন পার্ক হয়েছে। পার্কের ভেতরে পাহাড় আছে। পাহাড়ের নির্জনতায় ছোট ছোট কুটির। চাইলে সারাদিনের জন্য ভাড়া নেয়া যায়। শহরের সব প্রেমিক প্রেমিকেরা নাকি পয়সা খরচ করে প্রেম করতে ভীড় করছে ঐসব ভাড়াটে কুটিরে।
হাসান হাসে- যাওয়া যায়, পুরো দিনের জন্য আমরা ও একটা কুটির ভাড়া নিতে পারি।তবে কাল না। অন্য দিন।
-কাল নয় কেন?
- কাল বিকেলে অথৈর ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট আছে।
-ওহ!

তারপর ক’মুহুর্তে শীতাতপ যন্ত্রের একটানা আওয়াজ ছাড়া আর কোন শব্দ থাকেনা।হাসান টেবিলে আঁকিবুকি কাটে। চৈতীই ফের কথা বলে
-কি অবস্থা মেয়েটার?
-ভালো না। ডাক্তাররা কিছুই ধরতে পারছেনা। ডায়াগোনোসিস চলছে একটার পর একটা।কিন্তু
-ওর বাবা একটা অমানুষ
-ওঁহু। সবই পরিস্থিতি।
-একমাত্র মেয়ের এই অবস্থায় সে বিদেশে পড়ে থাকতে পারলো?
-সে বিদেশে আছে বলেই অন্ততঃ মেয়েটাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা যাচ্ছে
-বাচ্চাটাকে ওর বাবা চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে পারেনা?
-নাহ। ও নিজেই এখনো বৈধ হতে পারেনি।
-ও তোমার খুব ভালো বন্ধু ছিলো, তাইনা?

হাসান কথা বলেনা। বিরক্ত হয়। চৈতীকে আগে ও বলেছে, তবু কি এক অদ্ভূত কারনে এই প্রশ্ন সে বার বার করে। অথৈ’র বাবা ফয়সাল কখনোই ওর বন্ধু ছিলোনা। সহকর্মী মাত্র। হাসান যখন অফিসে জয়েন করে ফয়সাল তখন মাত্র ক’দিন হয় বিয়ে করেছে প্রেম করে। দু পরিবারেরই অসম্মতিতে।সে দুপুরের লাঞ্চ নিয়ে আসতো বাসা থেকে। হাসানকে জোর করে খাওয়াতো। একদিনের জন্য ও সে হাসানকে বাইরে লাঞ্চ করতে দেয়নি। বাসায় নিয়ে গেছে। ওর বৌ নীলার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, নীলার তখন বাচ্চা হবে। বাচ্চা হবার সময় প্রচুর রক্তপাত হলো, কাকতালীয় ভাবে রক্তের গ্রুপ মিলে গেলো হাসানের সাথে। হাসান রক্ত দিলো। বছর খানেক পর অফিসের এক প্রোগ্রামে আমেরিকা গিয়ে যখন ফয়সাল আর ফিরলোনা নীলা তখন হাসানকেই জানালো এটা তাদের পুর্ব পরিকল্পিত, আর্থিক দৈন্যদশা মেটানোর নাকি আর কোন পথ ছিলোনা।
আরো ক’দিন পর যখন অথৈ মেয়েটা অসুস্থ হলো- নীলা হাসানকেই জানালো, , আমেরিকা থেকে ফয়সাল ফোন করে অনুরোধ করলো ওর মেয়েটাকে নিজের মেয়ের মতো করে দেখতে, ওদেরকে দেখার আর কেউ নেই।
বন্ধন ভাল্লাগেনা, তবু জড়ায়-হাসান তবু জড়াতে থাকে নানা বন্ধন ও বিমুগ্ধতায়।

চৈতী হাসানের চুলে হাত ছোঁয়ায়। বলে- ‘আমার কিন্তু ভালো লাগে, এই যে একটা বাচ্চার জন্য তোমার এতো কেয়ার।তুমি খুব ভালো বাবা হবে, আমার চিন্তা নেই’
হাসান হাসে-‘ কি জানি, আমার বরং লালন ফকিরকেই ভালো লাগে।বলেছিলেন- জন্ম দিওনা, জন্ম দিলে আত্না খন্ডিত হয়ে যায়।‘
-'হয়েছে। তুমি লালন না। তুমি হলে হাসান। আমার হাসান'

প্রায় নির্জন আইসক্রীম পার্লারে চৈতী আরো ঘন হয়ে আসে, ঘন হয়ে আসে ওর চুলের ঘ্রান।
হাতের আঙ্গুল নিয়ে আনমনে খেলতে খেলতে ও বলে- যাবে এখন আমার সাথে? মেয়েটাকে দেখে আসি। ওর মা একেবারে একা।
চৈতীর হাত ফিরে যায়।
যেতে যেতে বলে - 'আজ আমার কাজ আছে।অন্য কোন দিন যাবো। আজ তুমি একাই যাও'

তারপর আর তেমন কথা এগোয়না। সমস্ত সুঘ্রান নিয়ে মেয়েটা চলে যাওয়ার পর ‘একা’ শব্দটা বড় ভারী ও তপ্ত হয়ে উঠে হাসানের জন্য।হিমহিম আইস ক্রীম পার্লারে ফিরে আসে সকালের হাসফাস, অসুখের ঘ্রান।

ক’বছর আগে কলেজের বন্ধু এন্টনীর সাথে ও বেড়াতে গিয়েছিলো খাসিয়া পল্লীতে। এন্টনীর দাদী থুত্থুড়ে বুড়ি নাকি হাত দেখে ভবিষ্যত বলে। কৌতুহলে সে ও বসেছিল বুড়ির পাশে। হাত ধরে রেখে দীর্ঘক্ষন, ফিসফিসিয়ে বুড়ি বলেছিল-‘ তোর তো শরীর ভরা অসুখ রে ব্যাটা!’

শরীর ভরা অসুখ নিয়ে গ্লাসডোরে ঠেলে বেরিয়ে আসে হাসান।

৩.
বাইরে প্রবল রোদ। থকথকে মানুষের দল। দলবদ্ধ জটলা। অথৈদের বাসায় যাবার জন্য রিক্সা, টেক্সী কিচ্ছু নেই।অলংঘনীয় জ়্যামে আটকে আছে গোটা শহর। জ্যামে আটকে আর্তনাদ করছে একটা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ী। একটানা হর্ণ বাজাচ্ছে। একচুল নড়ছেনা কেউ। হাসান রাস্তায় নেমে এসে হাঁটতে থাকে।

ফুটপাত বলে কিছু নাই। মানুষের শরীরের উপর দিয়ে গড়িয়ে হাঁটছে মানুষ। ছুটছে আরেকদল। আরেকদিক থেকে হর্ণ বাজাতে বাজাতে চলে গেলো পুলিশের গাড়ী। কেউ একজন চিৎকার করে বললো-শহরের প্রধান বিপণীতে আগুন লেগেছে। বেশ উঁচুতে আগুনের শিখা। অনে দূর থেকে তার হল্কা এসে ধাক্কা দিলো।

হাসানের শরীর জ্বলছে। কাল ফেরার আগে পিঠে নখের আঁচড় বসিয়ে দিয়েছিলো নীলা।সারা রাত জ্বলেছে, এখন জ্বলছে আবার ।
শহর জ্বলছে। শরীর ভর্তি আগুন নিয়ে হাসান দৌড়ায় এবার।

দৌড়ের ভেতর অসুখের ঘ্রান পায় হাসান অথবা অসুখের ঘ্রান নিয়েই দৌড়ায়। দৌড়ায় অথচ চোখ খুলতে পারেনা, চোখ খুলে তাকাতে পারেনা। যেনো চোখের ভেতরে মুঠো মুঠো বালি ঠেসে দেয়া। কড়কড়ে অস্বস্তি।

Tuesday, May 19, 2009

।।ব্যক্তিগত পোষাক।।



কফিপটে উত্তাপ।ফুলদানীতে তাজা ফুল।ঘ্রানহীন,রংচঙ্গে।জানলায় ভারী পর্দা।দেয়ালজুড়ে আয়না।

শামীম হায়দার আয়নায় নিজেকে দেখলেন।নিজের প্রতিবিম্ব দেখলেন।শরীরের শীর্নতা ফুরিয়েছে অনেক আগেই।তলপেটে কিছুটা মেদ জমলেও নিজের নগ্ন শরীরকে এখনো ভালো না লাগার মতো সময় আসেনি।শিশ্ন আপাতঃ শিথিল।

কোমরে তোয়ালে জড়ালেন। ভারী পর্দা সরালেন কিঞ্চিৎ।বিকেলের আলো এলো ঘরে।

বালিশে মুখ গোঁজে থাকা সোহানা আক্তার মুখ ফেরালেন।ভ্রুঁতে প্রশ্নবোধ।

শামীম হায়দার পর্দা টেনে দিলেন।

হলিডে হোমসের এই ঘরে এখন আর বিকেল নেই।

স্ত্রী জানেন জরুরী মিটিং আছে।মিটিং শেষে ডিনার পার্টি।ফিরতে রাত হবে।বেশ রাত।বিদেশী ব্যাংকের স্থানীয় শাখার প্রধান ব্যবস্থাপকের এমন রাত হয়। স্ত্রী অভ্যস্ত। সন্তানদ্বয় ও।

বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্ধ্বতন প্রভাষিকা সোহানা আক্তারের ব্যবসায়ী স্বামী আমদানী কাজে সিঙ্গাপুর।একমাত্র সন্তান শ্বাশুড়ীর কাছে নিরাপদ।ছাত্র-ছাত্রীদের একটা অনুষ্ঠান আছে।ফিরতে দেরী হবে।

শামীম হায়দারের ব্যাংক সোহানা আক্তারের বিশ্ববিদ্যালয় দুটোই যথাক্রমে একটি সুপারমার্কেটের চতুর্থ সপ্তম তলায়। সতের বছর তাদের দেখা হয়নি।দেখা না হওয়ার সতের বছর তারা সুপার মার্কেটের চতুর্থ সপ্তম তলায় কার্যরত ছিলেন তেমন ভাবনার কোন কার্যকারন নেই।

শামীম হায়দারের বাবা ছিলেন মফস্বল শহরের সমাজসেবা কর্মকর্তা। আর সোহানা আক্তারের বাবা ছিলেন শিক্ষা কর্মকর্তা। দু কর্মকর্তাই সেই মফস্বলে বদলী হয়ে এসেছিলেন অন্য কোন মফস্বল থেকে।উপজেলা চত্বরের মধ্যে পাশাপাশি নিবাস ছিলো তাদের। শামীম হায়দার সোহানা দুজনই তখন অষ্টম শ্রেনী।

শামীম হায়দার বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়-কালো প্যান্ট,সাদা সার্ট,বাটার জুতো। সোহানা আক্তার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়- সাদা সেলোয়ার,আকাশী জামা, সাদা উড়না।সোহানা ইতিমধ্যে প্রেমে পতিত।উপজেলা চেয়ারম্যানের চাচাতো ভাই যে কলেজের একাদশ শ্রেনীতে, সে টিফিন পিরিয়ডে বালিকা বিদ্যালয়ের গেটে এসে দাড়ায়। সাইকেলের টুংটাং আওয়াজ হয়।চিঠি বিনিময় হয়।একদিন সন্ধ্যেবেলা বিদ্যুৎবাতি কোন কারনে না জ্বললে উপজেলা শিক্ষাকর্মকর্তার সরকারী নিবাসের দেয়াল টপকে কে যেনো ভেতরে ঢোকে। কর্মকর্তাটি স্ত্রী সমেত গিয়েছিলেন দাওয়াত খেতে এক বিদ্যালয় শিক্ষকের বাড়ীতে। বৃত্তি পরীক্ষা সমাগত বলে একমাত্র কন্যাটি একাকীই ছিলো।

শীর্ণ শামীম হায়দার তার জন্য বেজায় ভারী ছাত্রসখা বইটি নিয়ে সেই সন্ধায় কড়া নেড়েছিল সোহানাদের দরজায়। দরজা খুলেনি কেউ। আসন্ন বৃত্তিপরীক্ষার ইংরেজী রচনা কোনটা বেশী ইম্পোর্টেন্ট - ‘এইম ইন লাইফ’ নাকি ‘জার্নি বাই বোট’ সেই সিদ্ধান্তে আসা জরুরী ছিলো তার জন্য, জরুরী ছিলো সোহানার সাথে কথা বলা। তাই ক্রমাগত কড়া নাড়া প্রত্যাখান তাকে অসহিষ্ণু করে তুলছিল। পেছনের দেয়ালের নীচ দিয়ে ভিতরে ঢোকার একটা পথ জানা ছিলো তার। দেয়াল টপকানো ক্লেশটুকু করতে হয়নি তার।

যে উপগত ছিলো সে দেখিনি, যে শয্যাগত ছিলো সে দেখেছিলো। শামীম হায়দার পালিয়ে এসেছিলো।

একুশ বছর পর, সুপারমার্কেটের ছাদে গড়ে উঠা বাহারী রেঁস্তোরার একবারে কোনার টেবিলে বসে সোহানা আক্তার যখন বলছিল- ‘অনেক দিন আমি অর্গাজমের আনন্দ পাইনি’ শামীম হায়দারের মনে পড়ে গিয়েছিল সেই সন্ধ্যা, সেই সন্ধ্যায় কি আনন্দ পেয়েছিল সে?

জিজ্ঞেস করা হয়নি। কিন্তু সেই রাতে, রেঁস্তোরা থেকে ফিরে আসার পর রাতে তার স্ত্রী দীর্ঘদিন পর অর্গাজমের আনন্দ পান।চোখ বন্ধ নি;শ্বাস নিচ্ছিল শামীম অর্ধ-উত্থিত শিশ্নে ঠোঁট বুলিয়ে স্ত্রী বিড়বিড় করেন- ‘আই লাভ ইউ ম্যান’

খোলাপিঠ নিয়ে সোহানা আক্তার আবার উপুড় হন। শামীম জানালার কাছ থেকে ফিরে আসেন।

-কিছু বলবে?

-নাহ

-খারাপ লাগছে?

-নাহ

-অনুশোচনা

-নাহ!

বিছানার পাশে একটা সিডি প্লেয়ার।আগে খেয়াল হয়নি কারো। খেয়াল করার মতো ধৈর্য্য ছিলোনা কারো।আলগোছে বাটন টেপা হয়। অপরিচিত কন্ঠ গেয়ে উঠে চেনা গান

‘চেয়ে থাকি দাঁড়িয়ে দ্বারে, চেয়ে থাকি

যে ঘরে প্রদীপ জ্বলে তার ঠিকান কেউ না বলে

বসে থাকি, বসে থাকি পথের নিরালায় গো

চিররাতের পাথার পাড়ে হায়গো…

এয়ারকন্ডিশনারের ঠান্ডায় শীতবোধ হয়।

শামীম হায়দার কফিপট থেকে কফি ঢালেন। এক কাপ। এক কাপ খালি থাকে। ভারী পর্দা সরান আবার। সন্ধ্যা ঘনাচ্ছে। এখন আর বিকেলের রোদ নেই। ঘরের ভেতর আলোর প্রবেশ নেই। সোহানা আক্তার তার খোলা বুক নিয়ে চোখ মেলেননা এবার।

হলিডে হোমসের বাইরের দিকের বাগানে একজোড়া ছেলেমেয়ে।পরস্পরকে জড়িয়ে আছে। মেয়েটার হাতে কিছু একটা। অতোদূর থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়না। আইসক্রীম হতে পারে। মেয়েটা ছেলেটার মুখে তুলে দিচ্ছে। দুজন হাসছে।

শামীম হায়দার, সোহানা আক্তারকে শুনিয়ে বলেন- 'দেখো, ওরা প্রেম করছে।'

Tuesday, May 05, 2009

।। কবি ও প্রেমিকাগন ।।



আমার এমন হয় ।
দীর্ঘ প্রস্তুতির বিনিময়ে কোন কোন কাজ শেষ করতে গিয়ে, শেষ মুহুর্তে আমাকে আঁকড়ে ধরে অবসন্নতা । মনে হয়, থাক । বরং বাদ দেই, বরং ফিরে যাই…

প্রথম যেদিন রিমি’র জামার বোতাম খুলেছিলাম-আমার দীর্ঘ প্রস্তুতি ছিল সেটা,মনে আছে । কারো কারো এইসব সহজে হয়ে যায় । আমার হয়না । বেশ তো ক’দিন হয়ে গেল । এখনো মনে আছে, রিমি’র জামায় পাঁচটা বোতাম ছিলো । ও চোখ বুঁজে ছিলো । আমি প্রথম বোতামে বেপরোয়া ছিলাম,দ্বিতীয় বোতামে কামার্ত, তৃতীয় বোতামে সাহসী হয়ে চতুর্থ বোতামে অবসন্নতা ।মন বলছিল- থাক এতোটুকুই, বাদ দেই এবার, ফিরে যাই । মুহুর্তের অমনোযোগীতায় রিমি চোখ খুলেছিল আর হাতের আঙ্গুল ও অবাধ্য হয়েছিল আমার ।

এই বিকেলে কালো গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সেই একই রকম ফিরে যাওয়ার আকুতি টের পাই নিজের ভেতর অথচ এই বিকেলের জন্য, এই গেটের সামনে দাঁড়ানোর জন্য কতোদিনের অপেক্ষা আমার!
এবারো হাতের আঙ্গুল অবাধ্য হয়ে উদ্ধার করে আমাকে । কলিং বেল চাপি ।
মধ্যবয়স্ক কাজের লোক এসে গেট খুলে দেয় ।
আমার কি কিছুটা মন খারাপ হয়?

লোকটা নাম জিজ্ঞেস করে,তারপর জানান দেয়-তিনি ভেতর ঘরে অপেক্ষায় আছেন । আমি লোকটাকে অনুসরন করি কেবল । অনুসরন করতে করতে ঘাড় ঘুরিয়ে বাড়ীটা দেখি । খুব পুরনো নয় অথবা বাড়ীটা পুরনোই,নতুন করে সাজানো হয়েছে । দোতলায় টানা ছাদ, নিচে বেশ বড় একটা বাগান, বাগান পেরিয়ে মুল বারান্দা । আমরা বারান্দায় উঠি । বারান্দা পেরিয়ে ভেতর ঘর ।

ভেতর ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে তিনি। বয়স হয়েছে বুঝা যায় কিন্তু চিবুকে এখনো স্নিগ্ধতা ও আভিজাত্যের মিশেল । বেশ ঘরোয়া কিন্তু দামী শাড়ী জড়ানো গায়ে । কোন কোন মুখ দেখলে সাদা-কালো এলবামের ধ্রুপদী ছবি মনে হয় । এ মুখ সেরকম ।

তাঁর চোখে কৌতুহল,ঠোঁটে চাপা হাসি ।
-টেলিফোনে গলা শুনে আপনাকে আরো বয়স্ক মনে হচ্ছিলো ।
আমি হাসি । সবিনয়ে বলি-
-আমাকে তুমি করে বললে খুশী হবো ।
-ঠিকাছে, ভিতরে এসো ।

আমরা ভেতরে যাই।কাজের লোকটা অন্য কোথাও চলে গেছে।এই ঘরে শুধু তিনি এবং আমি। বেতের সোফায় বসি।পাশের সোফায় বসতে বসতে তিনিই কথা শুরু করেন-
-আমি কিন্তু তোমাকে ঠিক চিনতে পারিনি ।

নাম শুনে চিনে ফেলা অসম্ভব জেনেই আমি আমার নামটা বলি । তারপর বলি
-আমি ঢাকা থেকে এসেছি । সিনেমা বানাই
-ওহ । শুটিং করতে এসেছো? আমাদের ছোটবেলায় এখানে কতো শুটিং হতো । এখন মনে হয় সেরকম হয়না ।
-আমি ঠিক ওরকম সিনেমা বানাইনা । ডকুমেন্টারী করি ।
-আচ্ছা!

টের পাই-আমার সামনে যিনি বসে আছেন-এই শহরের সরকারী বালিকা বিদ্যালয়ের অবসর নেয়া প্রধান শিক্ষিকা,যার স্বামী বছর কয়েক আগে প্রয়াত, ছেলে মেয়েরা লন্ডন ও নিউইয়র্কে সেটেলড, নিজে ও বছরের বেশীর ভাগ সময় এখন বাইরে থাকেন- তার ভেতর আমাকে নিয়ে যুগপৎ কৌতুহল ও অস্বস্তি কাজ করছে ।
আমাদের মধ্যে ছেঁড়া ছেঁড়া কথা হয়
-আমি গত সপ্তাহে লন্ডন থেকে ফিরেছি । এতো ঠান্ডা পড়েছে এবার । ভাল্লাগেনা থাকতে ।
-আমি জানি ।
-জানো?
-জ্বি । আপনার ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম । ফিরেছেন জেনেই আমি এসেছি ।

এবার তিনি স্পষ্ট করে আমার দিকে তাকান । কন্ঠ একটু ও না কাঁপিয়ে বলেন
-ঠিক কি কাজে তুমি এসেছো, বলোতো?

আমি বুকের একটু গভীরে বাতাস টেনে নেই । ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলি
-একটা ডকু ফিল্ম বানাতে যাচ্ছি । আপনার সাহায্য দরকার । ইনফ্যাক্ট আপনার সাহায্য ছাড়া আমি পারবোনা । সেজন্য আপনার লন্ডন থেকে ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম ।

তিনি হেসে উঠেন
-তোমার ফিল্ম বানাতে আমি সাহায্য করবো? কি সাহায্য করবো বলোতো? নানী-দাদীর ক্যারেক্টার করতে হবে? আমি জীবনে ও অভিনয় করিনি ।
তার হাসিতে আমি ও হাসি
-৩০ বছর আগে জন্ম নিলে আপনাকে আমার ফিল্মের নায়িকা বানাতাম
এবার আমরা দুজনেই একসাথে হেসে উঠি ।

হাসির রেশ থামার আগেই আমি জরুরী কথাটা বলে ফেলি
-একসময়ের বিখ্যাত একজন কবি’কে নিয়ে আমি ফিল্ম করতে চাচ্ছি । তার জীবনের জরুরী কিছু বিষয় আপনার সাথে জড়িত । এ গুলো আমার জানা দরকার ।
খুব স্থির কন্ঠে তিনি বলেন
-কার কথা বলছো তুমি?
-কবি রায়হান মুস্তাফিজ ।
-তুমি কে?
-আমি তার ছেলে ।

তিনি আর্তনাদের মতো আমার অগ্রজের ডাক নাম উচ্চারন করেন ।
-ও আমার বড় । খুব ছোটবেলায় আপনি ওকে দেখেছেন । আমার জন্ম তার পরে । আমরা তখন এ শহর ছেড়ে চলে গেছি ।


কাজের লোক ট্রলি ভর্তি নাস্তা নিয়ে ঢুকে । আমাদের কথায় স্তব্দতা নেমে আসে । তিনি আমাকে গাজরের হালুয়া এগিয়ে দেন । আমি নাড়াচাড়া করতে থাকি ।
কাজের লোক বেরিয়ে গেলে তিনিই আবার কথা শুরু করেন
-তোমার বাবা আমার কথা বলেছে?
-না । মা ।
- ও । কেমন আছেন তিনি?
-মা মারা গেছেন চার বছর আগে ।
- আমি দুঃখিত ।
-না ঠিকাছে । মারা যাওয়ার আগের দুবছর মা বিছানায় পড়েছিলেন । বড় ভাই কানাডায় চলে গেছে । বাবা ও তার মতো সময় কাটাতো । একমাত্র আমি মায়ের পাশে বসে থাকতাম । সেই সময়ে প্রথম আপনার কথা শুনি । মা অনেক গল্প করতো আপনার ।
-তোমার মা খুব ভালো ছিলেন ।
-আপনার তো বান্ধবী ছিলেন ।
-এক সাথে পড়েছি ।

কথা আবার থমকে যায় । তিনি বাবার কথা জিজ্ঞেস করেননা । তার জানতে ইচ্ছে করেনা নাকি অস্বস্তি?
-মায়ের মৃত্যুর পর বাবা ও চলে গেছে বড়ভাই এর কাছে । কিডনীর সমস্যায় ভুগছে ।
-ও
-বাবার সাথে আমার কখনোই তেমন ঘনিষ্ঠতা হয়নি । মা বিছানায় শুয়ে শুয়ে এতো গল্প করতো মানুষটাকে নিয়ে, পরে মনে হলো তাকে নিয়ে একটা ফিল্ম করা যায় ।
-তোমার মায়ের কাছে আর কি শুনেছো?
-বাবা এবং আপনার দীর্ঘসম্পর্ক ছিলো । আপনি চমৎকার গান গাইতেন আর কবি হিসেবে বাবার খ্যাতি ও ছড়াতে শুরু করেছে, সাথে ভালো চাকরী । প্রথম দিকে কিছুটা আপত্তি থাকলে ও শেষপর্যন্ত দু পরিবারের সম্মতি ছিলো । ছোট্ট মফস্বল শহরে আপনারা ছিলেন আদর্শ জুটি । কিন্তু…
-শেষ পর্যন্ত আমাদের বিয়ে হয়নি ।
-ঠিক এই বিষয়টাই আমি জানতে চাইছিলাম ।
-কেনো তোমার মা তোমাকে বলে যাননি?

আভিজাত্য ও স্নিগ্ধতা জড়ানো কন্ঠে তার এই প্রথম আমি কিছুটা শ্লেষের ইংগিত পাই ।
-না । এটা মায়ের কাছে ও রহস্য ছিলো ।
-তিনি তোমার বাবার বিবাহিত স্ত্রী ছিলেন ।
-মা আপনার বান্ধবী ছিলেন
-আমরা একসাথে পড়েছি ।
-যাইহোক । আপনি তো জানতেন তাকে । অতোটা সপ্রতিভ কখনোই ছিলেন না । নিজের ভেতর গুটিয়ে থাকতেন । বাবার সাথে ও তাকে আমরা খুব বেশী কথাবার্তা বলতে দেখিনি ।
-কিন্তু তোমার বাবা তো তাকেই বিয়ে করেছিলেন
-হ্যাঁ । আমার মায়ের কাছে ও এটা শেষদিন পর্যন্ত রহস্য ছিলো বাবা কেনো শেষপর্যন্ত তাকে বিয়ে করেছিলেন ।
-তাই নাকি? ভালো ।

আমি টের পাই একটা জটিলতা স্পর্শ করছে তাকে । আমি যা জানতে চাইছি তার বদলে কথাবার্তা চলে যাচ্ছে একজন প্রয়াত ও দুজন প্রায় বৃদ্ধ মানুষের বিগত যৌবনের হিসেব-নিকেশে । এখানে দাঁড়িয়ে আমি কার প্রতিনিধিত্ব করছি ? আমার মৃত নিস্প্রভ মায়ের,মৃত্যুর মুহুর্ত পর্যন্ত গুনী স্বামীর প্রতি যার অগাধ মুগ্ধতা ছিলো নাকি আমার সংস্পর্শহীন বাবার যাকে আমাদের কোনদিন তেমন করে বুঝে উঠা হয়নি ?
কিন্তু আমি তো এসব থেকে নিজেকে আলাদা রেখে প্রফেশনালী কিছু তথ্য জানতে চাই শুধু ।

আমি সমস্ত অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলে এবার সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করি
-কবি রায়হান মুস্তাফিজের সাথে শেষপর্যন্ত আপনার বিয়েটা হলোনা কেনো? আমার ফিল্মের জন্য এই তথ্যটা জরুরী । প্লিজ আপনি ইজিলি আমাকে বলেন, সমস্ত প্রস্তুতি শেষে ও কেনো রায়হান মুস্তাফিজ বিয়েটা ভেংগে দিলেন ?

ঢং করে আওয়াজ দিয়ে না উঠলে আমি খেয়ালই করতাম না ঘরের দেয়ালে একটা বিশাল ঘড়ি । তার পেন্ডুলাম দুলছে ।
ঠোঁট কামড়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন । তার মুখের রঙ এতোটা সাদা আগে খেয়াল করিনি ।
-আছরের ওয়াক্ত হয়েছে, আমি নামাজ পড়তে যাচ্ছি । তুমি নাস্তাটা শেষ করে যেও ।



তিনি তার সমস্ত আভিজাত্য ও স্নিগ্ধতা নিয়ে চলে গেলে আমি স্থির দাঁড়িয়ে থাকি । পুরনো দিনের বিশাল দেয়াল ঘড়ির কাটাগুলো টিক টিক করে । বছর পঁয়ত্রিশ আগের সদ্য তরুনীকে আমার দেখতে ইচ্ছে জাগে । মফস্বল শহরের তার সৌন্দর্য্য রুপকথার মতো ছড়িয়ে বেড়াতো । মৃত্যুশয্যায় শুয়ে শুয়ে ও আমার মা সেই গল্প বলতেন । তার বলায় কোন হিংসা ছিলোনা । স্বামীর সাবেক প্রেমিকার জন্য তার নিজের ও মুগ্ধতা ছিলো । নাকি এই প্রসিদ্ধ সৌন্দর্য্যকে অস্বীকার করে বাবা তাকেই বিয়ে করেছিলেন বলে আমার অপ্রতিভ, গুরুত্বহীন মায়ের গোপন অহংকার ছিলো?

বাবা লোকটা চিরদিন আমার কাছে বিরক্তিকর এক রহস্য থেকে গেলো । আমি তার মতো এতোটা নির্মোহ, নিমগ্ন অথচ অন্যদের কাছে গুরুত্বপূর্ন হয়ে উঠতে পারলাম না । মায়ের প্রতি তার কোন মনোযোগ ছিলোনা তবু মায়ের কি অসীম মুগ্ধতা ছিলো এই মানুষটার জন্য। দীর্ঘ সম্পর্কের পরিনতিতে বিয়ের সমস্ত আয়োজন শেষে যে প্রেমিক অস্বীকৃতি জানায় তার জন্য ও এই ধ্রুপদী সুন্দরীর এতো অভিমান?
লোকটাকে আমার অসহ্য ঠেকে ।

-তোমার বাবার বিরহের শখ জেগেছিলো । তার কবিত্বের পূর্নতার জন্য নাকি ওটা জরুরী ছিলো

আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখি । তিনি ভেতরের সিঁড়ি ভেংগে নেমে এসেছেন আবার । এবার তাকে অনেকটা স্থির দেখাচ্ছে,যদি ও চোখ দুটো লাল হয়ে আছে ।
-জ্বি!
-হ্যাঁ, তুমি তো এটাই জানতে চেয়েছিলে । বড় কবি হওয়ার লোভে তোমার বাবা আমাকে বিয়ে করেননি । তিনি বড় কবি হয়েছেন ।
-ও
আমি কোন ভাষা খুঁজে পাইনা ।
-আমাদের যেদিন আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ের দিনতারিখ ঠিক হবার কথা সেদিনই তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন, কবি হওয়ার জন্য তার বিরহের অভিজ্ঞতা খুব জরুরী । যেনো আমি তাকে সেই অভিজ্ঞতা দান করি । তোমাকে বাবাকে আমি বড় কবি হবার জন্য বিরহ দান করেছিলাম

আমার কাছে সবকিছু পাজলের মতো লাগে । তার দিকে আমি চোখ তুলে তাকাতে পারিনা । যেনো রোমান সম্রাজ্ঞীর দারুন গরিমা নিয়ে তিনি এক কবিযশপ্রার্থী অপরিপক্ক তরুনকে মৃত্যুদন্ড দান করছেন ।
এই গরিমা, তার কন্ঠের তেজ আমার কাছে অসহ্য লাগে ।
-তোমার সিনেমাটা বানানো হলে আমাকে জানিও । বহুদিন সিনেমা দেখিনি । কি নাম দেবে সিনেমার?

বাহ। মুহুর্তের মধ্যে আমি আমার না বানানো সিনেমার নাম খুঁজে পাই । এই নামই হবে গরিমাময়ী সম্রাজ্ঞীর বিরুদ্ধে আমার সামান্য অস্ত্র ।
- সিনেমার নাম হবে ‘কবি ও প্রেমিকা গন’
-প্রেমিকা গন ! ‘গন’ কেনো?

আমার অস্ত্র তবে একেবারে ভোঁতা নয় । তারদিকে আর না তাকিয়ে বাইরে দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বলি
-কারন কেবল আপনিই কবি রায়হান মুস্তাফিজ এর একমাত্র প্রেমিকা ছিলেন না ।

আমি তার দিকে তাকাইনা আর ।
কিন্তু তার নিচু কন্ঠের স্পষ্ট উচ্চারন শুনি
-তুমি তোমার বাবার মতোই হয়েছো ।

সম্রাজ্ঞীর আহত কন্ঠ কেমন গোঙ্গানীর মতো শোনায় । বেদনাহত । আমি চোখ নিচু করি ।

কোন কোন দূরত্ব এতো অনতিক্রম্য হয়ে উঠে কেনো?


[ লিখেছিলাম সচলায়তনে মার্চ ২০০৯]

যাপনচাতুর্য

আমার ছোট্ট ফ্লাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সকালটা দেখতে বেশ ভালোই লাগছিলো । এই ফ্লাটে উঠেছি মাসছয়েক । কেনা নয় অবশ্য,ভাড়া ।পছন্দ-অপছন্দে আমি ততোটা চৌকস নয়-তা সে বৌ কিংবা ফ্লাটই হোক ।রিনি’র ভালো লেগেছে-এটাই যথেষ্ট ।

ছুটিরদিনের সকালবেলা ঘুম না ভাংগলে ও চলে কিন্তু ছুটিরদিনেই আমার ঘুম ভেংগে যায় সকালবেলা,বরং রিনি বেশ বেলা করে জাগে । আমি ওকে ঘুমোতে দেই,ঘুমোক বেচারী । এককাপ চা করে প্রায়ই এসে দাঁড়াই এই বারান্দায় ।
প্রথম প্রথম অনেকদূর পর্যন্ত দেখতে পেতাম ।রাস্তার উলটো দিকে একটা নারকেল গাছে ঘেরা টিনের বাড়ী । এক মধ্যবয়স্ক পুরুষ সকালবেলা তার ছেলেকে পড়াতে বসেন বারান্দায়, আমার দেখতে ভালো লাগে । এখন বাড়ীটার সামনে বহুতল এপার্টমেন্ট উঠছে,আমার দৃষ্টিসীমানা সংকুচিত হয়ে আসছে । এখনো সেই নারকেল গাছ ঘেরা টিনের বাড়ি,মধ্যবয়স্ক পুরুষের ঘর গেরস্থালী,সন্তানকে শিক্ষাদান দৃষ্টগোচর হয়, এপার্টমেন্ট পুরো হয়ে গেলে আর হয়তো দেখা হবেনা ।

মাসতিনেক আগে স্বাতী যখন ফ্লোরিডা থেকে এলো দেশে,আমাদের এই দু রুমের ফ্লাটে থেকেছিলো দুতিনদিন । রিনিই একরকম জোর করে ওকে নিয়ে এসেছিল । রিনি আর স্বাতী খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো নিঃসন্দেহে ।
স্বাতী একটা চমৎকার দুরবীন এনেছিল আমার জন্য । আমার জন্য? না,স্বাতী আসলে আমার জন্য কিছু আনেনি ।আমি আর রিনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম , ও লাগেজ থেকে দুরবীনের বাক্সটা বের করে এন বলেছিল-‘তোদের ছেলে হবে নিশ্চয়ই, ওর জন্য এটা’
আমরা খুব হেসেছিলাম । বিয়ের প্রায় পাঁচবছর,আমরা কোন সন্তান নেইনি এখনো ।

স্বাতীর দেয়া দূরবীনটা চোখে ধরলেই সেই নারিকেল গাছে ঘেরা বাড়ীটা আরো কাছে চলে আসে । মধ্যবয়স্ক লোকটা কাঠের চেয়ারে বসে,তার শিশুপুত্র বসে বেতের মোড়ায়,কোন কোন দিন দেখি ঘোমটা দেয়া এক মহিলা চা-মুড়ি এনে রাখে ওদের সামনে । শিশুটা শুকনো মুড়ি চিবোয়,লোকটা চায়ে ঢালে ।

দুরবীণ উলটো করে ধরলে আরো মজা হয়-কাছের রাস্তা,রিক্সা,এপার্টমেন্ট,মানুষজন অনেক দূরে সরে যায়,দূরে যেতে যেতে অনেক অনেক দুরে চলে যায় সবকিছু,অনেক পিছনে । অতো পেছনে গিয়ে আমি একটা চাবাগান ঘেরা টিলার উপর এসে দাঁড়াই,দাঁড়িয়ে আরো বহুদূর দেখার চেষ্টা করি ।
স্বাতী আমাকে জিজ্ঞেস করে- কি দেখতে চাও অতোদূরে?
-আমি এখানে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখতে চাই ।
-পাগল,এখানে সমুদ্র কোথায়?
-নেই হয়তো । কিন্তু আমার ইচ্ছে একটা জাহাজে চড়ে আমি গভীর সমুদ্রে যাবো , আমার হাতে একটা দূরবীন থাকবে । জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে দুরবীন দিয়ে দেখবো আরো দুর দুর নীল সমুদ্র

আমার সমুদ্রযাত্রা হয়নি । স্বাতী আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ফ্লোরিডায় চলে গিয়েছিল ছয় বছর আগে ।

জোবায়ের গিয়েছিলো লন্ডনে,বিয়ে করে । স্বাতী আটলান্টিক পাড়ি না দিলে কিংবা জোবায়ের বিয়ে করে লন্ডন চলে না গেলে-বোধহয় আমার আর রিনির বিয়ে করা হতোনা ।
বোধ হয় কেনো? নিশ্চিতভাবেই হতোনা । এরকম কিছু হওয়ার কথা কিংবা ইংগিত ছিলোনা ।

অথচ আমি তখন উদ্ভ্রান্ত,রিনি ও ডানাভাংগা । আমাদের অপ্রাপ্তি,আমাদের দুজনের ভিন্ন ভিন্ন স্বপ্নের লাশই শেষ পর্যন্ত আমদেরকে কাছে নিয়ে এসেছিল । আমার ও তখন আর কেউ নেই, রিনি ও নিঃসংগ । দুজন পরাজিত মানুষ পরস্পরকে আঁকড়ে ধরেছিলাম ।
এখন কেবল ছুটিরদিনের সকালবেলা এইসব ভাবার অবসর পাই আমি,যখন রিনি ঘুমিয়ে থাকে । যতোক্ষন রিনি জেগে থাকে ততোক্ষন ও আমাকে সব ভুলিয়ে রাখে শরীর ও স্নেহ দিয়ে, আমি ও ওকে সব ভুলিয়ে রাখি সবকিছু মেনে নিয়ে । আমি ও রিনি ভালো থাকি,ভালোবাসি পরস্পরকে-মৃতপ্রায় মানুষ যেমন তার ক্ষয়ে যাওয়া জীবনকে । ও কখনো স্বাতীর প্রসংগ তোলেনা,আমি ও জোবায়েরকে মনে করিনা ।

স্বাতী আটলান্টিক পাড়ি দেয়ার পরের দিনগুলো আমার বিভীষিকার মতো কেটেছিলো, ওর জন্য আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতো,আমার অনুভূতি আমাকে তীব্র আহত করতো । রিনি বদলে দিয়েছে সব,স্বাতীর জন্য আমার অনুভূতি ও বদলে গেছে এখন । এখন মাঝে মাঝে রিনির নগ্ন শরীরে আমি স্বাতীর মুখ বসিয়ে দিতে পারি,রিনির ভেতরে যখন প্রবেশ করি, মাঝে মাঝেই নির্দ্বিধায় চোখ বন্ধ করে শরীরের নিচে আমি স্বাতীকে আঁকড়ে ধরতে পারি । কষ্ট-টষ্ট কিছু নেই আর, আমার প্রবৃত্তি দিয়ে স্বাতীকে ছুঁয়ে ফেলতে পারি এখ্ আর গোপনে আমার বড় আনন্দ ও জাগে । আমার শরীরের নিচে শুয়ে নিরাভরন রিনি জোবায়ের পিঠেই তার নখ বসিয়ে দেয় কিনা,সে অবশ্য আমি কোনদিন জানতে চাইনি ।

স্বাতী বেড়াতে এলে আমরা খুব মজা করেছিলাম, স্বাতীর মেয়ের জন্য রিনি অনেকগুলো ড্রেস কিনেছিলো । বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোর মতো আমরা তিনজন ঘুরে বেড়িয়েছি, আমরা জোবায়েরকে ও মিস করেছি । ও ব্যাটা এলে সেই পুরনো দিনের মতোই আবার আমরা চারজন ।

আজ রিনি ঘুম থেকে উঠলে আমরা এয়ারপোর্টে যাবো । কি এক জরুরী কাজে জোবায়ের ওর বৌ-ছেলেকে রেখে একাই আসছে লন্ডন থেকে,আমাদের ফ্লাটে উঠবে প্রথমে,তারপর ওর বাড়ি যাবে ।

আমার আর রিনির না জন্মানো ছেলের জন্য স্বাতী দুরবীন এনেছিল । আমার খুব আগ্রহ হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যত মেয়ের জন্য জোবায়ের কি উপহার আনে?

আমাদের বিয়ের প্রায় পাঁচবছর হয়ে গেলো । ডাক্তার বলে দিয়েছে,আমাদের কোনদিন সন্তান হবেনা ।

[ লিখেছিলাম সচলায়তনে মার্চ ২০০৮]

আধূলী

শহর সিলেট এবার নগর হচ্ছে।
কীন ব্রীজ ছেড়ে চলে গেছে মিস্টিক কপোত-কপোতী।
চৌহাট্টার ছায়া ঢাকা পথ হবে এভিনিউ।
এক ক্ষ্যাপাটে হাস্যকর মন্ত্রীর অসুস্থ ফ্যান্টাসীর শিকার হবে দুপাশের কৃষ্ণচূড়া সব।

খুব দ্রুত ইট কাঠ পাথরের স্তুপে পরিণত হচ্ছে একদা ভীষণ প্রিয় এই শহর। অদ্ভুত উন্মাদনা প্রতিবেশে। ঘর-বসতি ভেঙে গড়ে উঠছে মার্কেট। সমস্ত দীঘি-জলাশয় বুজে দিয়ে মার্কেট। আর সকল মানুষ বদলে গিয়ে কেবলই ক্রেতা-বিক্রেতা।
ক্রেতারা আসে টেমস এর পাড় থেকে। যদিও সেখানে তারাই বিক্রেতা। শ্রম বিক্রী করে হোটেলে, রেষ্টুরেন্টে। কিন্তু সুরমা পাড়ে এসেই ভূমিকা বদলায়। পাউন্ড ভাংগিয়ে সুন্দরী বউ কেনে, শিক্ষিত বর কেনে, গাড়ী-গয়না, হেরোইন কেনে, মানুষের দীর্ঘশ্বাস কেনে।

আর বিক্রেতারা আসে ধরলা, করতোয়া, সোমেশ্বরী’র তীর থেকে। কেউ কার্তিকের মংগার গ্রাস, কেউ নদী ভাংগনের দীর্ঘশ্বাস- কেউ ফেরারী আসামী-এই রং লাগা, টাকা উড়া শহরে সবার এক ডাক নাম ‘আবাদী’। প্রায় অস্পৃশ্য, গালি-গালাজের মতউচ্চারিত এই শব্দের তকমা জড়িয়ে তারা নিজেদের বিক্রী করে। রিকশা টানে, পাথর ভাঙে, ‘কামলা’ খাটে।
আর এই ক্রেতা-বিক্রেতার ভীড়ে এই শহরের নিজস্ব মানুষ যারা চা-পাতার মত ঘন সবুজ, কমলা লেবুর মত ঘ্রানময়, তারা বিলুপ্ত ক্রমশ:। তারা হারিয়ে যাচ্ছে কীণ ব্রীজের কপোত কপোতীর মতো, এই শহরের বিখ্যাত সুন্দরের মত।

চৌহাট্টা পয়েন্ট থেকে রিকাবী বাজারের দিকে হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে খুব একা আর অপ্রাসংগিক মনে হচ্ছিল হাসানের। এ শহরে এখন কোন বন্ধু নেই, এ শহরে এখন কোন প্রেমিকা নেই। এ শহরে পরম শত্রু হবার যোগ্য কোন মানুষও নেই। মানুষ নাকি প্রতি মুহূর্তে বদলায় নদীর জলের মতো, গভীর নিরিখ ছাড়া বদল বোঝা যায় না- কে যেন বলেছিল, এখন আর মনে পড়ে না। যাকে চেনা হয় তার একটা অংশ কেবল চেনা, বাকীটুকু নিজের মত করে বানিয়ে নেয়া আর বানানোটুকুকেই পরিচিত বলে মেনে নেবার মিথ্যে পস্টবোধ। দীর্ঘ সহবাসেও মানুষ থেকে যায় মানুষের চেনার অতীত।

রাস্তার পাশে একটা জটলা, ভিড়বে কি ভিড়বে না- ভাবনা শেষ হবার আগেই ভীড়ে যায় হাসান।
ঠেলাঠেলি পার হয়ে দেখতে পায়, এক প্রায় বৃদ্ধ চিৎপাত-
‘কিতা ব্যাফার, কিতা অইছে’-কেউ জানেনা।
জটলার পাশে একটা খালি রিকসা।

চিত্রনাট্য বুঝে নিতে দেরী হয় না হাসানের। ধরলা করতোয়ার করাল গ্রাসে বসত বাটি বিলিয়ে দিয়ে , আজীবন ভূমিপুত্রদের একটা বড় অংশ এসে এই শহরে ‘রিকসাওয়ালা’ হয়। 'হালার হালা আবাদী' হয়। লাঙ্গল ধরা হাতে রিথার হ্যান্ডেল ধরে। টাকা পয়সা যা কামায় তাতে অন্তত: বেঁচে থাকে কিন্তু এই শহরের লোকদের কথা তারা বুঝে না। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরাও তুই তোকারী করে, কথা না বোঝলে চড় থাপ্পর মারে, কখনো কখনো তার থেকেও বেশী।
জুলাইয়ের প্রচন্ড দুপুরে র্রিক্সা টানতে না চাওয়ার অপরাধে এই শহরে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে এক ‘হালার হালা রিক্সা ওয়ালা’কে। এই সেই শহর যেখানে ধর্মের জিকির উঠে সব থেকে বেশী।

কিন্তু হাসান ধর্মের ঢেকুর তুলে না বলে, এই বণিক শহরের একজন হয়েও ক্রেতা হয়ে উঠেনি বলে, বিকলাঙ্গ ভীড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে।
রথাথ অচেতন শরীরটাকে কোলে তোলে নেয়।
বাকীরা সার্কাস দেখে বিনে পয়সায়।


[২]
-রোগীর নাম বলেন।
- নাম তো জানিনা।
- জানেন না মানে? নিজের রুগীর না জানেন না, মানে কি?
- আরে ভাই, রোগী তো আমার কেউ না। রাস্তায় পড়েছিল- তাই...
- তাই কি? এখানে নিয়ে এলেন? থানায় খবর দিয়েছেন? যদি কিছু হয়ে যায় রিস্ক কে নেবে- আপনি?
হাসান থমকে যায়। এতো মহাযন্ত্রণা। একটা মানুষ মরতে বসছে। তবু হাসপাতালের বদলে যেতে হবে থানায়? পুলিশ কি করবে? মেরে ফেলা ছাড়া তো কাউকে বাঁচিয়ে তোলার ইতিহাস পুলিশের নেই ।

‘আরে হাসান বাই, কিতা খবর?’ প্রায় ফেরেশতার মত এসে দাঁড়ায় ছেলেটা। এক পুরনো বন্ধুর ছোট ভাই। মনে হয় ইন্টার্নী করছে। হাসান তার হাত ধরে সব কিছু বুঝিয়ে বলে। ছেলেটা এখনো ডাক্তার হয়নি বলে কসাই হয়ে উঠেনি। খুব দ্রুত সে সব কিছু ম্যানেজ করে, ইমার্জেন্সী থেকে করিয়ে নিয়ে আসে জেনারেল ওয়ার্ডে। বিশ্রী দুর্গন্ধ । তবু সৌভাগ্যের মত দুর্লভ একটা বেড ও ম্যানেজ হয়।

বসে থাকে হাসান। লোকটার এখনো জ্ঞান ফেরেনি। এবড়ো থেবেড়ো চেহারা। বাংলাদেশের মানচিত্রের মতো । এই সুরমা পাড়ের যারা টেমস পাড়েযায় শ্রম বিক্রি করতে তারাও তো এই লোকটার মতোই। তারাও কি ওখানে এরকম নতজানু, অসহায়, আক্রান্ত ’? তাহলে এই শহরের মানুষেরা এই সব নদীভাঙ্গা সরল মানুষদের সহমর্মী হয় না কেন?
নাকি টেমস পাড়ের অসহায়ত্ব-বিকৃত আভিজাত্য আর আক্রোশ হয়ে প্রকাশ পায় সুরমা তীরে? তাহলে কি এই আক্রান্ত লোকটাও দুচার হাজার টাকা জমিয়ে যখন ফিরে যাবে তার ধরলা করতোয়ার নিরণ্ণ জনপদে, তখন সেও একই রকম মেকী অভিজাত ও নিষ্ঠুর হয়ে উঠবে?

ভাবনার সুতো ছিঁড়ে কফিনের কাপড় মোড়ানো এক কুৎসিত নার্স। কর্কশ সুরে প্রায় চিৎকার করে উঠে।
-এই ওষুধগুলো লাগবে। নিয়ে আসেন।
-কেন, হাসপাতালে ঔষধ নেই? বলা হয় না।
-রাতে রোগীর সাথে কে থাকবে?
-‘কেন? আপনারই তো থাকার কথা
না এই কথাও বলা হয় না।
ঔষধের তালিকা হাতে নিয়ে বাইরে বেরুতেই নিকষ অন্ধকার। কখন যে রাত নেমে এসেছে। সিঁড়ি হাতড়ে নিচে নামতে নামতে এক পাশে মহিলা ওয়ার্ড। দরজার পাশে মেঝেতে শুয়ে এক যুবতী ছটফট করছে প্র সব বেদনায়।
পাশে কেউ নেই।
না ডাক্তর, না নার্স, না ঈশ্বর।


[৩]
হাসপাতাল ক্যান্টিনের ঠান্ডা সিংগারায় কামড় বসায় হাসান।
চড়া স্বরে বাজছে হিন্দী সিনেমার গান- ‘তেরে নাম’। গানের সুরটা খুব সুন্দর। ওদের সব সুন্দর। গান সুন্দর, গায়িকা সুন্দর, নায়িকা সুন্দর, পোষক সুন্দর, পণ্য সুন্দর। আর এই সব সুন্দর সর্বনাশ গ্রাস করে নিচ্ছে সমস্ত আবহ। হাসান দিন গোনে আরেকটা ৫২’র। কিন্তু ভরসা পায় না তেমন।
যদিও প্রবল প্র তিরোধের মুখে কানকুনে ভেংগে গেছে বিশ্ব বণিক সমিতির ষড়যন্ত্র সম্মেলন। কিন্তু সভ্যতার নামে শেষ পর্যন্ত শুয়োরের বাচ্চারাই জিতে যাবে।

নিজস্ব বলে কিছু থাকবে না কোন রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র আর ভর্তুকী দেবেন শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিতে। বীজের দাম বাড়বে, সারের দাম আকাশ ছোঁয়া, হাসপাতাল ঔষধ শূন্য। ধরলা, করতোয়া, ব্রম্মপুত্র পাড়ের মানুষ আরো বেশী নিরণ্ণ হবে- ‘কামলা’ হবে। বিশমাতব্বরেরা ফসলের স্থান নির্ধারণ করে দেবে দেশে দেশে। সমস্ত খাদ্য শস্য উৎপাদন হবে টেক্সাস এর বিশাল প্রান্তরে। আর এই দরিদ্র রাষ্ট্র তবে কী উৎপাদনের সুযোগ পাবে? তামাক আর পপি ফুল?
বাসি সিঙ্গারার ঠান্ডা ছড়িয়ে পড়ে হাসানের সমস্ত শরীর ও স্বত্বায় ।
হাসপাতালের বেডে যে শুয়ে আছে যে বিগত প্রায়- কোথায় যাচ্ছে ?
হাসান দাঁড়িয়ে আছে বর্তমানে- কোথায় আছে?
মহিলা ওয়ার্ডের নোংরা মেঝেতে শুয়ে থাকা মায়ের গর্ভ থেকে যে আসছে, সে-কোথায় আসছে?

মাথার ভেতর আরো ঘন হয়ে আসে কুয়াশা।
ক্যাসেট প্লেয়ার এ এবার কন্ঠ বদলায়।
‘তেরে নাম’ এর বদলে সাঈদীর আওয়াজ।
আরো সুন্দর, আরো সুরেলা।
আরো সর্বনাশ।

[ লেখা হয়েছিল ২০০৪ এর প্রথম দিকে ]

রুচিরা ও হাওয়ার নাবিকগন

১.
‘কৃষ্ণচুড়া বিরহে উড়ে রাধাচুড়া চৈত্রের ধূলো
কোন শোকে পাতা ঝরে
ঝরে আমার বিষণ্ণতাগুলো ...’


আজ আবার আমাদের হাওয়ায় ভাসার রাত। এর আগে শেষবার আমরা হাওয়ায় ভেসেছিলাম বছর দুয়েক আগে। তখন আমরা আরো সবুজ, আরো নরম ছিলাম। আর নরম ছিলাম বলেই হয়তো সে সময় আমাদের সবার খুব চেষ্টা থাকত নিজেদের খুব শক্ত দেখাতে।
সে জন্য আমরা চোয়াল শক্ত করে শ্লোগান দিতাম, রাগী রাগী চেহারা করে ক্যাম্পাসে মহড়া দিতাম আর অন্য সবাইকে ভাবতাম আমাদের প্রতিপক্ষ । আমাদের কারো কাছে সত্যি সত্যি দু’একটা নিরীহ চেহারারঅস্ত্র থাকত। মাঝে মাঝে এগুলো উঁচিয়ে সত্যি সত্যিই কাদের যেন আমরা তাড়া করতাম।

সেই তখন, তখন আমাদের অনেক বন্ধু ছিল এবং অনেক শত্রু ছিল। আমরা সব বন্ধু এবং শত্রুদের কেউ কেউ এক হয়েছিলাম বছর দুয়েক আগের সেউ সন্ধ্যা য়। দিন তারিখ মনে নেই তবে মনে আছে- সে সন্ধ্যায় আকাশে চাঁদ ছিল না। দু’একটা তারা জ্বলবে কি জ্বলবেনা ঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারছিল না। আমরা গোল হয়ে বসে ছিলাম রিপন-কে ঘিরে।

বসেছিলাম ওদেরই দু’তলার ছাদে। ছাদে তখন বাতি ছিল না। বেশ দূরে স্ট্রীট লাইটের আলো এবং টুং টাং গীটার। রাসেল তখনো গীটার বাজানো ছেড়ে দেয়নি। শফিক খুব মনোযোগ দিয়ে মসলা বানাচ্ছিল। এখনো ওর মত চমৎকার মসলা কেউ বানাতে পারে না। তখন আমরা ওকে এম.ডি. ডাকতাম- ‘মাষ্টার অব ড্রাগস’।

এম.ডি. প্রথম স্টিকটা তুলে দিয়েছিল রিপনের হাতে। তারপর এক দম এক দম করে প্রত্যেকে। সে সময় বেশ তাড়াতাড়ি আমাদের ‘হাওয়া-যাত্রা’ শুরু হয়ে যেত। সবাই-ই যখন ভাসছিলাম সে সময় ছাদের সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে এসেছিল মঞ্জুর।
...তারপর অনেক রাতে বিদায় নিয়ে যখন ফিরছি কেউ কাঁদিনি। কেবল মঞ্জুর হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিল রিপনকে জড়িয়ে ধরে। আমরা অবাক হয়েছিলাম অথবা আমাদের কারোরই তখন কোন বোধ ছিল না। কেবল আমার মনে পড়েছিল মাত্র ক’দিন আগে মঞ্জুর এল.জি. লোড করেছিল রিপনকে শুট করবে বলে।

পরদিন রিপন চলে গেল লন্ডন। মঞ্জুর ও গেল... আরো ক’দিন পর। রিপনে র ঠিকানা জানি। ২২ আগষ্ট ওকে কার্ড পাঠাই। মাঝে মধ্যে খুব ইচ্ছে হয় কিন্তু মঞ্জুরকে কিছু পাঠাতে পারিনা;
...ওর ঠিকানায় পৃথিবীর কোন ডাক পিয়ন পৌঁছাতে পারেনা ।


২.
‘সে মেয়ে সহজে
দু’ডানার ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে তোমাকেই খোঁজে
শুধু তার পাখি চোখ ভিজে উঠে সবুজ শিশিরে...’


আমরা তখন সংখ্যায় অনেক ছিলাম।
তারপর; এই অনেকের মধ্যে আমরা ক’জন- আমরা পাঁচজন ধীরে ধীরে বদলাতে লাগলাম। মিছিলে, মহড়ায়, হাওয়ায় আড্ডায় আমাদের ক্রমশঃ অনুপস্থিতি। আমরা নিজেদেরকে বদলাতে লাগলাম অথবা একজন আমাদের বদলাতে লাগলো।
সে হল রুচিরা। হঠাৎ করে কিভাবে যেনও আমাদের পাঁচজনের বন্ধু হয়ে গেল। তারপর আমাদেরকে বদলাতে লাগল। তাও নিঃশব্দে নয়, সশব্দে এবং প্রকাশ্যে । ওর সাথে বন্ধুত্ব রাখতে হলে নিয়মিত ক্লাশ করতে হবে- আমরা ক্লাশে শে হাজির ; রুচিরা চমৎকার ইংরেজী বলে, আমরা ভর্তি হলাম স্পোকেন ইংলিশের ক্লাসে। রুচিরা’র শখ হল কম্পিউটার শিখবে। ওর সাথে আমরাও একটা কম্পিউটার ইনস্টিটিউটে । কিসের আর কম্পিউটার শিখা। বরং আমরাি কম্পিউটারকে শিখাই আড্ডার যাবতীয় রকম সকম।

রুচিরা বোধ হয় জয়ীতা হবার স্বপ্ন দেখত। কিন্তু ও কখনো আমাদেরকে আনন্দ, সুদীপ কিংবা কল্যাণ হতে বলেনি। হয়তো বুঝতে পারতঃ আমাদেরকে দিযে ওসব হবে না। আশেপাশে কেউ কেউ প্রেম করত। আমরা হাসি-ঠাট্টা , বিদ্রুপ করতাম পৃথিবীর সমস্ত প্রেমিক প্রেমিকাদের নিয়ে; ‘আশার আলো’ রেন্ডুরেন্টে তিনকাপ চা ছয়জনের জন্য ভাগ করতে করতে রুচিরা বলেছিল- ‘তোদের জন্য এ জীবনে আমার আর প্রেম করা হলোনা’। সম্ভবতঃ আসিফ জিজ্ঞেস করেছিল 'কেন?' এ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলেছিল- ‘কেন আবার? যে মেয়ে পাঁচ পাঁচটা ছেলের সাথে ঘুরে বেড়ায় তার সাথে প্রেম করবে কে?’

এ বছর পহেলা জানুয়ারি আমরা ছ’জন মিলে বেশ একটা নির্জন চা বাগানে গেলাম। বাগানের ভেতর একটা চমৎকার লেক। লেকের জলে অসম্ভব সুন্দর নীল শাপলা। রুচিরা অবশ্য বলেছিল নীলপদ্ম । এরকম নীল শাপলা অথবা নীলপদ্ম আমি দেখিনি এর আগে। সে নাকি দেখেছে। জিজ্ঞে স করেছিলাম- ‘কোথায় দেখেছিস?’ ও বলেছিল- ‘স্বপ্নে। আমার নীল স্বপ্নে। আমার অনেক রংয়ের স্বপ্ন আছে , লাল স্বপ্ন, নীল স্বপ্ন। তোদের নিয়েও আমার একটা স্বপ্ন আছে। স্বপ্নটার রং হল...'

সেদিন আর স্বপ্নটার রং জানা হয়নি। আমরা একটা নৌকা পেয়ে গেলাম এবং নৌকা নিয়ে ঘুরলাম অনেক বেলা। টুকটাক অনেক কথা ও বলেছিল।
-যদি এখন নৌকা ডুবে যায়! আমি সাঁতার জানিনা যে,
পুলক বলেছিল- -কিচ্ছু হবে না আমি খুব ভালো সাঁতার জানি। তোকে ডুবতেই দেবোনা।
-আচ্ছা ধর, হঠাৎ ডাকাত এসে যদি আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়
আমি বলেছিলাম - কিযে বলিস তুই! আমরা বেঁচে থাকতে কেউ তোকে ছিনিয়ে নিতে পারবেনা।
- আর যদি আমার বিয়ে হয়ে যায়!


৩.
ঝিনুক নীরবে সহো, নিরবে সহে যাও
বুকে নিয়ে বালির বিষ, নিরবে মুক্তো ফলাও...’

আজ রুচিরার বিয়ে ছিল। আজ আমাদের বন্ধুর বিয়ে ছিল।
আমরা শেষ আড্ডা দিয়েছিলাম সাতদিন আগে ‘আশার আলো’য়। ঐদিন আমরা ছ’জন ছ’কাপ চায়ের অর্ডার দিয়েছিলাম। আমরা খুব মজা করতে চাচ্ছিলাম রুচিরাকে ঘিরে। আবীর আবার কোত্থেকে সাতটা লাল গোলাপ এনে দিয়েছিল রুচিরার হাতে- ‘অভিনন্দন বন্ধু !’
রুচিরা হেসেছিল। খুব হেসেছিল। হাসতে হাসতে হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠেছিল। দু’হাতে মুখ ঢেকে রুচিরা কাঁদছিল। আমরা খুব অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলাম, আমার ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছিল ওর মাথায় হাত রাখি। এমনিতে কতদিনই তো এমন করেছি। অথচ ঐদিন কিছুতেই হাত উঠছিলনা। কি একটা অস্বস্তি। কেউই আমরা বুঝতে পারছিলাম না কি করা উচিত। বুঝে উঠতে পারছিলাম না রুচিরার কান্নার রহস্য । ওরতো কোন প্রেম ছিল না। তবু কান্না কেন?
ওর সাথে আমাদের আর কথা হতে পারেনি। ও চলে গিয়েছিল। যাবার আগে বলেছিল- ‘আমার বিয়েতে তোরা কেউ যাবিনা!’

তবু আজ দুপুরে গিয়েছিলাম আমরা পাঁচজন। যখন কমিউনিটি সেন্টারে ঢুকছি ঠিক তখন মাইক্রোতে করে রুচিরাকে নিয়ে আসা হল পার্লার থেকে। ওকে কোনদিন তেমন করে সাজতে দেখিনি। মাইক্রো’র দরজা খুলে যখন ওকে নামানো হচ্ছে আমাদের পাঁচ জোড়া চোখ থমকে গেল, বিস্মিত হল। যেন আমরা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না এই আশ্চর্য্য সুন্দর মেয়েটা আমাদের বন্ধু!
রুচিরা চোখ তুলে তাকায়নি তবু মনে হল যেন ও আমাদের দেখেছে। বর এল কিছুক্ষন পর। লম্বা চওড়া সুপুরুষ। তবু ব্যাখ্যাতীত কোন এক কারণে বরকে আমাদের কারোই ভাল লাগল না। বরকে দেখার পর পরই কেন জানি আমরা প্রত্যেকে কুঁকড়ে যেতে থাকলাম নিজেদের ভেতর। কিন্তু কেউ কারো কাছে ধরা দিতে চাইলাম না। খেতে বসলাম। কেউই খেতে পারলাম না। মনে হচ্ছিল যেন একটা প্রচন্ড বিরক্তি গ্রাস করছে আমাদের প্রত্যেককে।

কেউ কারো সাথে বলার মতো কোন কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমাদের কেউই তো হাবাগোবা গোবেচারা নই। দু'বছর আগেও লাল পাউডার আর এসিড মিশিয়ে ঝটপট ককটেল বানাতাম। এখনো পাঁচজন এক সাথে দাঁড়ালে...। তবুও নিজেদেরকে খুব অপাংক্তেয় মনে হচ্ছিল ঐ জমজমাট আসরে। আমরা বেরিয়ে আসছিলাম নিঃশব্দে । গেটের কাছে চলে এসেছি। এসময় খুব সাজগোজ করা একটা মেয়ে এসে দাঁড়াল আমাদের সামনে। তারপর আমাকে বলল- ‘রুচিরা আপনাকে ডাকছে’।


৪.
‘কে আর অমন কাক ডাকা ভোরে একা ফিরে আসে
আমি ফিরে আসি, আমি ফিরে আসি...একা!’


যেন দু’বছর আগের সেই সন্ধ্যা।
আজও আকাশে চাঁদ নেই। আজও তারাদের দ্বিধা। আমরা বসে আছি একটা টিলার উপর। আমাকে ঘিরে আমার চার বন্ধু । পুলক, আসিফ, আবীর, রাসেল। যে প্রশ্ন এরই মধ্যে কয়েকবার করা হয়ে গেছে, সে প্রশ্ন ওরা আবারো করল আমাকে। আমি অসহায় হয়ে হাতজোড় করে বললাম- ‘বিশ্বাস কর ভুলে গেছি। রুচিরা কি বলেছে, আমি মনে করতে পারছিনা।’
তারপর; আবারো নিঃস্তব্দতা। আসিফ মসলা বানাচ্ছে। আমার ড্রাগমাষ্টার শফিকের কথা মনে পড়ছে। অস্ত্র মামলায় সাত বছরের জন্য ও জেলে। ওর বদলে আমরা যে কেউ থাকতে পারতাম-যদি না ঐ জীবন থেকে আমরা পাঁচজন পালিয়ে আসতাম।

এবার আমরা গোল হয়ে বসি। আসিফ প্রথম স্টিক আমার হাতে তুলে দেয়। আগুন ধরাই। চোখ বন্ধ করি। কপালে দু’হাত ঠেকাই। প্রথমে ছোট করে, তারপর লম্বা এক টানে ধোঁয়া নিয়ে যাই ফুসফুসে, কিছুক্ষন আটকে রাখি তারপর ঠেলে পাঠাই মস্তিস্কে । কিছু বেরিয়ে যায় নিঃশ্বাসের সাথে। স্টিকটা পাচার করি বামে আবীর হাতে।
এবার কল্পনায় সেই পাখীটাকে ডাকি। দু’বছর আগে প্রতি সন্ধ্যায় ফুসফুসে ধোঁয়া ভরে আমি যে পাখী হয়ে যেতাম। গাংচিল, সোনালী ডানার শঙ্খচিল অথবা ঈগল। ওরকম কোন পাখী আমি সত্যি সত্যি আমি দেখিনি কোনদিন। তবু সে আসত আমার ভাবনায়। তার ডানায় রোদের ছায়া, গলায় অদ্ভুত নীল রং আর চোখে রাজ্যের নিঃসঙ্গতা। আমি সেই পাখী হয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠতাম। অনেক উঁচু উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের চুড়োয় মেঘেরাও উঠতে পারে না। মেঘের ভেসে বেড়ায় পাহাড়ের বুকে। আমি মেঘের ভেতরে ঢুকতাম তখন, দুডানায় জলের ছোঁয়া নিয়ে উঠে যেতাম উপরে, অনেক উপরে। কিন্তু কোনদিনই আমি পাহাড়ের চুড়ো পেরুতে পারিনি।

চারহাত ঘুরে স্টি্ক আবার আসে। আবার প্রণাম করি। পাখীটা এবার অবয়ব নেয়া শুরু করে। আমি সমস্ত আমাকে প্রবেশ করাই তার ভেতরে। এরপর শুরু করি দুডানায় ভর করে আমার অন্তরীক্ষ যাত্রা । খুব দরদী গলায় কে যেন গেয়ে উঠে- ‘আমার হইলোনাতো সুখের মিলন/হইলোনা শুকসারী দর্শন/এমনই কপাল’...-হয়তো আসিফ গাইছে। তবু মনে হচ্ছে দূরে, অনেক দূরে কোথাও কে যেন কাঁদছে। কে যেন ডাকছে। কে যেন কি বলছে আমাকে।
পাহাড় দেখছি এবার। পাহাড়ের মেঘ দেখছি। আমর দু’ডানা ভিজে যাচ্ছে, আজ আমি উপরে উঠব। অনেক উপরে। আজ পেরুবো সকল চুড়ো। ডানায় ক্লান্তি নামে। পাহাড় চুড়োয় যেন কার ছায়া। কে যেন বসে এখানে।

মঞ্জুর! আমাদের বন্ধু মঞ্জুর!। যে মঞ্জুর গুলি খেয়ে মারা গেল। যে মঞ্জুর মারা না গেলে মারা যেতাম আমাদের যে কেউ।
সেই রাতে ফিরছিলাম এই পাঁচজন আর মঞ্জুর। এ রকম এক জোৎস্না শূন্য রাতে হঠাৎ যখন ওরা হিট করল আমরা দিশেহারা হয়ে গেলাম। আমাদের কাছে কিছু ছিল না। আর আমরা টলছিলাম। কেবল মঞ্জুর কাছে একটা এল.জি ছিল এবং সে ঘুরে দাড়াল। এই সুযোগে পালালাম আমরা পাঁচজন। পরদিন হাসপাতালে সবার সাথে আমরাও মঞ্জু্রের লাশ দেখেছি। অথচ কাউকে কিচ্ছু বলিনি। বলিনি যে, আমরাও সাথে ছিলাম। মৃত্যু আমাদের তাড়া করছিল তখনো। এরপরই ঐ জীবন থেকে আমাদের প্রত্যাবর্তন অথবা পলায়ন।

পাহাড় চূড়োয় মঞ্জুরকে দেখে আমার প্রমিথিউসের কথা মনে পড়ে যায়। রুচিরা আমাকে প্রমিথিউসের গল্প শুনিয়েছিল। মানুষকে আগুন এনে দেয়ার অপরাধে তাকে নাকি আটকে রাখা হয়েছে কোন পাহাড়ের চূড়োয়। এই কি সেই পাহাড়? এই কি তবে প্র মিথিউস? কিন্তু ওর মুখে যে বন্দীত্বের কোন ছাপ নেই কেবল বিজয়ীর আভা। বরং আমিই সমস্ত ক্লান্তি নিয়ে বসে পড়ি ওর পায়ের কাছে। ও খুব নরম করে আমাকে বলে
- কিরে বেঁচে থাকতে কেমন লাগে?
আমি আরো ক্লান্ত হয়ে যাই। আরো অপরাধী হয়ে বলি;
- ‘ক্ষমা করে দে দোস্ত । তোর মতো আমাদের সাহস ছিল না মরে যাওয়ার’
মঞ্জুর হাসে।
- 'যারা মরতে জানেনা, তারা মৃত্যুর হাত থেকে ফেরাতেও জানেনা কাউকে’।

আমি বুঝিনা ওর কথা, আমি আবার পালাই। পেছনে হাসির শব্দ । বিদ্রুপের অথবা করুণার। আমি তবু উপরে উঠতে থাকি। আজ আমি সীমানা পেরুবই। আমার নিঃশ্বাসে শূন্যতা, মাথার ভেতর অনুরনণ- আমরা মরতে পারিনা, আমরা কারো মৃত্যু ঠেকাতেও পারিনা। কার মৃত্যু? আর কে মারা যাবে? আমার নিঃশাস বন্ধ হতে থাকে। ফুসফুস ব্যাকুল হয়ে উঠে।একফোঁটা নিঃশ্বসের জ্ন্য। সারা শরীর ভারী হয়ে আসে। আমার পতন হতে থাকে দ্রুত। নামছি দ্রত নামছি।
হঠাৎ আছড়ে পড়ি শক্ত মাটিতে। আমার ডানা ভেঙ্গে যায়। অসম্ভব ব্যথা। ব্যথা মানুষের স্মৃতি হরণ করে।ব্যথা মানুষের স্মৃতি ফিরিয়ে দেয়। মনে পড়ে। হঠাৎ আমার সবকিছু মনে পড়ে যায়। দুপায়ের উপর ভর করে উঠে দাঁড়াই। দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠি-
‘রুচিরা মারা যাবে। আমাদের কাপুরুষতার মুখে থুথু ছিটিয়ে রুচিরা মারা যাবে আজ রাতে। '

[মঞ্জুর... সত্যি আমাদের একজন ছিল। মঞ্জুর মারা গেল আগষ্ট ’৯৪-তে। সেই বেহিসেবী সময়ের অংশীদাররা কেউ ভুলিনি ওকে। ]


[ সহবাস- এর কোন এক সংখ্যার জন্য লিখেছিলাম '৯৮ এ]

নিঃশ্বাস, নীল অরণ্যে

‘ডেভলপমেন্ট ইকোনমিকস' -এর ক্লাসে ঘুম পাচ্ছিল হাসানের।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাস যে দিকেই গড়াক, নিজের আর পরিবারের আর্থিক সামর্থ ক্রমশ: তলানীতে এসে ঠেকছে- হঠাৎ মনে পড়তেই খুব শীত শীত করছিল হাসানের। ইচ্ছে করছিল সামনের ডেস্কের একেবারে কোণায় বসা প্রতীতির কাঁধে মাথা রেখে একটা লম্বা শ্বাস নেয়ার।

মায়ের অসুখটা ক্রমশ: বাড়ছে। জলের মত টাকা খরচ হচ্ছে। অনার্সের পর এম.বি.এ করার জন্য জমিয়ে রাখা বাবার পেনশনের টাকা এবার যাচ্ছে। তবু হচ্ছে না। হাসানের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আর নিঃশাসের সমস্যা হলেই প্রতীতির কাঁধে মাথা রেখে একটা লম্বা শ্বাস নেয়ার ইচ্ছেটা ও তীব্রতর হয়। আর সে মেয়েও হাসানের ইচ্ছে’র ঘ্রান পায়।
চোখের পাতা একটুও না কাঁপিয়ে যে ছেলে চোখে চোখ রাখতে পারে, একবার- কেবল একবার সে নাম ধরে ডেকে উঠতেই তো প্রতীতি হয়ে উঠতো তার অরণ্যের সবুজ।

কিন্তু কিছু কিছু পুরুষ সবুজ চেনেনা। বরং তারা অরণ্যের নীলে খোঁজে নিশ্চিত অবগাহন। কেননা সবুজকে তো আর সবাই ই সবুজ ডাকে!

ক্লাশের পর চার চাকার মোটযান ক্রমশ: দূর মিলায়-প্রতীতিকে নিয়ে।
পিছনে প্রযুক্তির বিষ- কালো ধোঁয়া।
নীল অরণ্যের পোষ্টম্যান হাসান-নিঃশ্বাসে আবারো কষ্ট ।

।।২।।
সূর্য জ্বলছে ।

বাড়ী ফিরতেই মৃদু গোঙানী। মায়ের। একরাশ নিঃশ্বাস অকারণে হারিয়ে যায়। ওঘর থেকে যন্ত্রণা ভেসে আসে।
কাঁধের ব্যাগটা রাখে। টেবিলের উপর-প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্ট, জীবনানন্দ। আবুল হাসান। যে কোন একটা পাতা খোলে আঙ্গুল
‘হলুদ সন্ধায় একা একা, আমি হায় কার অভিশাপে
এত নির্জনতা , বিমর্ষ স্তব্দতা এই আমার রক্তের, করছি কেবল পান’

বিছানার পাশে বাবা, বড় আপা, একজন বিব্রত ডাক্তার।
জ্ঞান নেই। চোখ বন্ধ। প্রচন্ড কষ্টে উঠানামা করছে বুকের হাপর।

হাসানের কেমন অদ্ভুত লাগে সব কিছু। পৃথিবীর এত আলো-তবু দৃষ্টি দিতে পারছেনা একজনকে। এত ভারী বায়ুস্তর । তবু নিঃস্বাস দিতে পারছেনা একজনকে। হুড়মোড় করে বাঁধ ভাঙে। প্রবল শোকার্ত বৃন্ডিপাত। হাসান থামতে দেয়না। যাক ভেসে যাক, ভেসে যাক সব। সে জানে জননীর এই তার শেষকৃত্য । এরপর যা হবে- সকলই আনুষ্ঠা নিকতা।

সন্ধ্যার পর সবাই গোরস্থান থেকে ফিরে। হালকা পাতলা শীত। মাথার ভেতর টলমল ক্লান্তি।

কাউকে ট্রেনে তুলে দিয়ে এল নাকি হাসান?
গভীর রাতের কোন ট্রেন?
মাঝরাতে ময়লা চাঁদ লোহার ব্রীজ পেরোয়। ট্রেন আর বিশাল জল। মধ্যে থেকে জেগে উঠে পৌরাণিক মিথের মত কোমল শৈশব। যেন পরিত্রাণ আছে আজো, আছে ফিরে যাওয়া। হায়! যন্ত্রনার তীব্রতা জুড়ে ভাঙা কাঁচের আড়শী।

প্রিয় প্রতীতি, মৃত জননী অথবা চুরি হয়ে যাওয়া নিঃশ্বাস- কে যেন ডাকনাম ধরে খুব ডাকতে থাকে হাসানকে।
তবু তার ফেরা হয়না।

[ বোধ করি ২০০১ এ লেখা ]

তাকে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস



১।

দোলনচাঁপা আমার ভীষন প্রিয় ।
ভেজা পাঁপড়ি গুলো যেন প্রেমিকার চিঠি।
ঠিক এই মুহুর্তে অবশ্য আর কোন প্রেমিকার মুখ মনে পড়েনা।
কেবল বাসি দোলনচাঁপার ঘ্রানের মতো আমার শৈশব ফিরে ফিরে আসে।

বসত-ভিটার আঁচল ভিজিয়ে ছল ছল বয়ে যায় এক নদী। আমি আমার মায়ের কোলে চরে আরো কত পথ ঘুরে ঘুরে এসে বসত গড়ি এই নদী তীরে।
মাথার উপর এক বিশাল শূন্যতা। নাম তার আকাশ। রং তার নীল। এখানে সূর্য উঠেনা। সূর্য আসে সাতটি ঘোড়ার রথে চড়ে।

উনুনে হাড়ি চাপিয়ে ধোঁয়া আর আগুনের মাঝে সারাদিন বসে থাকে মা। হাড়িতে কেবল জল ফোটে টগবগ সারাদিন। আমার পেটে ক্ষিধে ফোটে টগবগ সারাদিন। ক্ষিধের চোটে কান্না আসে। জল ভর্তি হাড়ি থেকে কেবল ধোঁয়া বেরোয়। ভাত নয়।

অবশ্য কোন কোন রাতে এসে হাজির হন কোন কোন খলিফা। মা তখন জোর করে অন্ধকারে আমাকে খেলতে পাঠায়। খেলা শেষে ফিরে এসে দেখি হাড়িভরা সাদা সাদা ভাত। দোলন চাঁপা ফুলের মত সাদা। আর দেখি মায়ের শাড়ী ভরা লাল লাল দাগ। রক্তের মত লাল।

মা নিজ থেকে বলে- 'ভয় পাসনে খোকা, ওটা ভাতের দাম'

তারপর মা অনেকক্ষন নদীর জলে ডুবে থাকে।
অনেকক্ষন পরে উঠে এসে বলে-
:বলতো খোকা নদী কোথায় যায়?
: কোথায় মা?
: নদী সমুদ্রে যায় রে ছেলে ।
:সমুদ্র কি মা?
:যে সব পাপ ধুয়ে নেয়, সবার সব পাওনা ফিরিয়ে দেয় ।
: আমি বড় হয়ে সমুদ্র হবো মা ...


২।

ইদানিং আরেক হাসান, হাসানের ছায়া প্রায়শ:আমাকে চোখ রাঙায়।
: আজকাল বড় বিশ্রীভাবে তুমি নিজেকে গুটিয়ে
নিচ্ছো ।

: হ্যাঁ নিচ্ছি। মনে হয় আর মানুষ নেই । গুটি
পোকা হয়ে যাচ্ছি ।
: এসবের কোন মানে হয় না !
: হয়তো হয়, হয়তো হয় না ।

আমি আয়নায় নিজের চেহারা দেখি। ঠোঁটের কোনে ক্রুর হাসি যেন শয়তানের উল্লাস। নিজের কাছেই নিজেকে বড় অচেনা মনে হয়। আমার নির্মোহতার ছায়ায় প্রতীতির লাশ।
: আশ্চর্য! মেয়েটা তোমাকে সব দিয়ে যাচ্ছে। অথচ
তুমি তার কেউ না ।

আমি বেশ জোর গলায় নিজেকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলি
:আসলে আজকাল আমি কোন কিছুতেই আগ্রহ পাই না। না ভালবাসায়, না ঘৃনায় । সব সম্পর্ক গুলো বিমূর্ত মনে হয় । আছে , অথচ নেই ...

: ছি -তুমি এরকম। বিশাস হয় না!

আমি এবার হাতের কব্জি ঘুরিয়ে নিজের কাঁধে রাখি। বলি
: বিশ্বাস করতে শেখো। ঐ তাকিয়ে দেখো গাছের পাতাগুলো সব ক্রমশঃ হলুদ । লোভাতুর নদীর জলে ভাসমান মাটির প্রদীপ,
সাতটি সুরের ছিদ্র ভালোবাসার মগ্ন ধ্যান....

আরেক হাসান, হাসানের ছায়া এবার আঁতকে উঠে। চিৎকার করে বলে--
:থামাও এসব। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ।
:আমারো হয়। কষ্ট হয় বিশ্বাসে ,অনুভবে, প্রতীতি তে ...


৩।

নদীর নাম স্বপ্নভূক।

আমি বসে থাকি তার তীরে। নদীর জলে পাপ দেখি। ভাসমান পাপ, সমুদ্রগামী পাপ।
লাল, নীল, হলুদ।

আমারতো সমুদ্র হবার কথা ছিলো। সব পাপ মুছে দেবার,সবার সব পাওনা ফিরিয়ে দেবার আশৈশব প্রস্তুতি আমার।
কিন্তু ভাল্লাগেনা।

জলের ছায়াকে বলি---
:আচ্ছা জীবনটাকে বদলে ফেলা যায় না?
:হ্যাঁ যায় ইচ্ছে করলেই বদলে ফেলা যায় ।
:তাহলে চলো ।
:কোথায়?
: তুমি তোমার পরিনতিকে অস্বীকার করো।
আমিও সমুদ্র হবার বদলে উজান হেঁটে চলে
যাবো উৎস মুখে।
: কেন?
: আমি আসলে সব কিছু শুরুটা দেখতে চাচ্ছি ।

মাঘী পূর্ণিমার রাত শেষ হতে থাকে। আমি বসে থাকি একা। দেখি ভোরের একটু আগে আমার মা এর মতো অন্য কেউ আবারো ভেজে জলজ অনুতাপে।
পাপ ভেসে যায়।
আমিও ভাসতে থাকি ক্যানাবিস এর ধোঁয়ায়,উজান কিংবা ভাটিতে ।।


[ কবেকার লেখা? মনে করতে পারছিনা '৯৭, '৯৮ হতে পারে , প্রবল আক্রান্ত ছিলাম আবুল হাসানে । তার এক কবিতার নামে এই গল্প ]

ভ্রমন আনন্দময় হয়েছিলো

.

।১।

'ভালো থাইকেন ওস্তাদ'

ওস্তাদ তার পোকায় খাওয়া দাঁত বের করে হাসলেন । জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন । আমি ও হাত বাড়ালাম ।
অর্ধেকে নেমে আসা 'অফিসার্স চয়েজ' এর বোতলটা হাতে চলে এলো । ওস্তাদের শুভেচ্ছার নিদর্শন । বোতলের অর্ধেক শেষ করেছেন ওস্তাদ, কোম্পানীগঞ্জ বাজার থেকে ভোলাগঞ্জ আসতে আসতে । আমাকে ও দয়া করেছেন অবশ্য । পাশের সীটে নজু ছিল । নামাজী ভদ্রলোক ব্যাটা । নাক কুঁচকেছে এই যা ।
ট্রাকের পেছন থেকে লাফিয়ে নামলো আবীর আর পার্থ ।
ওস্তাদ ট্রাক ঘুরালেন ।

আমাদের চার জোড়া চোখ এবার ঘুরে তাকালো আদিগন্ত । বহুদূর থেকে যা ছিলো রহস্যময় নীল, এখন তা স্পর্শের সবুজ । যেনো চাইলেই জড়িয়ে ধরা যায় । এই তো খাসীয়া পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে তূলো তুলো মেঘ । পাহাড়ের পায়ের নীচে ছেঁড়া ছেঁড়া নদী, পিয়াইন তার নাম । শত শত মানুষ পাথর কুড়োচ্ছে । শত শত মানুষ, অথচ কি ভীষন স্তব্দতা । যেনো সবার জানা হয়ে গেছে, এই বিশালতার কাছে এসে এরকম স্তব্দ হয়ে যেতে হয় ।
এই স্তব্দতাকে মাখতেই আমরা ছুটে এসেছি শহুরে গালগল্প পেছনে ফেলে ।

ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারীর কাছাকাছি কোথাও নাকি একটা সরকারী ডাকবাংলো আছে ।আবীরের বাবা'র জানাশোনা ।
একজন কেয়ারটেকার এসে আমাদের নিয়ে যাবার কথা । তার নাম শামসুদ্দিন । শামসুদ্দিন কে আমরা চিনিনা । তবে শামসুদ্দিন আমাদের চিনে নেবে ।

শামসুদ্দিন আমাদের চিনে নেয় । মধ্যবয়স্ক লোক । তেলতেলে মুখ । মুখে লাগানো হাসি ।
আমরা তার পেছনে পেছনে এগোই । পাথর দেখি । ছোট ছোট পাথর, বড় বড় পাথর । পার্থ নীচু হয়ে পিয়াইনের জলে হাত দেয় । কবি মানুষ, তাকে এই সব মানায় । আমি ঘাড় ঘুড়িয়ে মানুষ দেখি । সারি সারি 'বারকী' নৌকা ।
মানুষজন ডুব দিচ্ছে। ডুব দিয়ে তুলে আনছে বড় বড় পাথর । পেশি বহুল মানূষ গুলো । আমার সুলতানের ছবির মানুষের কথা মনে পড়ে যায় ।
আমরা এগিয়ে যাই । একটা বাঁক পেরোই । পেরোতেই অদৃশ্য হয়ে যায় পাথর কোয়ারী, 'বারকী' নৌকা আর পাথর কুড়ানো মানুষ । এখন কেবল তীব্র সবুজ । ঘন জংগল । আর কি আশ্চর্য, সেই জংগলের ভেতরই ডাকবাংলো ।

কেয়ারটেকার শামসুদ্দিন আমাদের নিয়ে আসে ভেতরে । পুরোটাই কাঠের । তিনটে বড় বড় রুম । সব গুলোই খালি । আমরা দুই রুম দখল করি । চমৎকার বিছানা পাতা । এমন কি বাথরুমে গরমপানি । পেছনে টানা বারান্দা । বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই চোখে পড়ে দীর্ঘ বালিয়াড়ি । বালিয়াড়ির শেষে বেশকিছু কাঠের ঘর । ঘরগুলো যেনো ঝুলে আছে খাসিয়া পাহাড়ে । ওপাড়ে একটা পাকা সড়ক চোখে পড়ে । সাপের মতো পেঁচিয়ে উঠতে উঠতে হঠাৎ করেই হারিয়ে গেছে পাহাড়ের গহীনে ।

আমাদের সকলের চোখে মুগ্ধ বিষ্ময় । আর শামসুদ্দীনের ঠোঁটের কোনে গর্বিত হাসি, যেনো এই একাকী সাম্রাজ্যের সেই নৃপতি ।
শামসুদ্দীন চলে গেলে, আমরা চারজন এসে বারান্দায় দাঁড়াই । ডিসেম্বরের পাহাড়ী ঠান্ডা গায়ে লাগছে । হাল্কাপাতলা খিদে ও লেগেছে । কেয়ারটেকার নিশ্চয় খাবারের ব্যবস্থা করবে । জিজ্ঞেস করা হয়নি এখনো ।
আমি 'অফিসার্স চয়েজ' এর বোতল বের করি । গলায় ঢালি । নজু নাক কুঁচকায় । আবীর বড়লোকের ব্যাটা । সস্তা মদে আগ্রহ নেই । তবু হাত বাড়ায় । আবীরের হাত থেকে বোতল যায় পার্থ'র কাছে । কবি বলেই কিনা কে জানে, বড় নির্মোহ ভংগীমায় সে গলায় ঢালে । দ্বিতীয় চক্করেই বোতল উলটে গেলো আর আমাদের তিনজনের একসাথে মনে পড়ে গেলো- তুমুল মাতাল হবার এক ভয়াবহ পরিকল্পনা নিয়ে এসেছি আমরা এই অরণ্যে । এই এলাকায় খুব সস্তায় দেদারসে পাওয়া যায় ভারতীয় মাল । আমাদের মাতাল হবার নেশা চাগিয়ে উঠে দ্রুত ।
শামসুদ্দিন' কে ধরতে হবে ।
কিন্তু হারামজাদা গেলো কই?

।২।
শামসুদ্দীন ফিরে এলো ভুনা মাংসের ঘ্রান নিয়ে ।
রাত কতো হলো আমাদের কারোরই বোধ করি খেয়াল নেই ।ডাকবাংলোতে ডায়ানামোর আলো । বাইরে সবুজ জোছনা । জোছনা ও সবুজ হয় এমোন! খাসিয়া পাহাড়ের গায়ে থোকা থোকা আলো ।পাহাড়ীদের গ্রাম ।

শামসুদ্দীন ফিরে এলো টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি খাবার নিয়ে । বিনয়ের অবতার হয়ে জানালো সে বড়ো শংকিত -তার 'মুখ্যসুখ্য' বৌ এর হাতের রান্না আমাদের ভালো লাগবে কিনা?
খাবার মুখ্য নয় তখন, আমাদের পানীয় প্রয়োজন ।

তেলতেল মুখে শামসুদ্দীন হাসে
'মামারা বড়ো দিরং হয়ে গেলো । এত রাতে কই পাই? ঠিক আছে তবু একটা ঘুরান দিয়া আসি'
আমরা ও 'ঘুরান' দেবো শামসুদ্দীন । সবুজ জোছনায় মাতাল হবো আজ ।

শামসুদ্দীন হাঁটে । আমরা হাঁটি । ডিসেম্বরের পাহাড়ী ঠান্ডা গায়ে কামড় বসায় । আবীরের গায়ে লেদার জ্যাকেট । 'হারামজাদা শুয়োরের বাচচা', চৈতী কে তুই ছিনিয়ে নিবি জানি আমি । ঐ যে গায়ে জোছনা মাখছে নিঃশব্দে, পার্থ-কবি সে, কবি বলেই চৈতীকে হারাবে । আমি জানি, জানি এই সব ।

ধবধবে বালিয়াড়ীতে আমরা হাঁটতে থাকি । উথালপাতাল দিক শুন্য পূর ।শামসুদ্দীন পাওইনিয়ার । এই মাতাল রাতে তৃষ্ণার জল খুঁজে দেবে আমাদের!
একটা ঘুপচির সামনে এসে থামে সে । দেখে মনে হয়ে কোনো পাথর শ্রমিক থাকে । টিমটিমে কুপির আলো । আমি ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে ফেলে আসা আলোকিত ডাকবাংলো দেখি । অর্থহীন ।
শামসুদ্দীন ঘুপচি থেকে বেরিয়ে আসে । মাথা নাড়ে । আমরা হতাশ হই ।কোন কথা নেই । কোনো কথা বলার নেই ।

ব্যর্থ পাইওনিয়ার ফিরতি পথ ধরে ।
আমাদের কেবল অনুসরন ।
এই তৃষ্ণার্ত রাত কতো দীর্ঘ হবে কেজানে?
ডাকবাংলোর আলো কাছে চলে এসেছে ।
শামসুদ্দীন একটুপিছিয়ে আসে । আমাদের কাছাকাছি আসে । গলা খাঁকারী দেয় । তেলতেলে হাসে ।
'মামারা, বোতল তো মিললোনা । কাইল ঐপার থাইকা এক কেইস আইনা দিমুনে । তয় এখন যদি--'
আমরা নিঃশ্বাস ফিরে পাই । ভরসা দাও কমরেড !
শামসুদ্দীন আবারো তেলতেলে হাসি ছুঁড়ে দেয়
'এখন যদি ইনজয় করতে চান, মনে লয় ম্যানেজ করতে পারুম । লাগাইবেননি?'
নজু নাক কোঁচকায় । একমাত্র সেই মাতাল নয় । বাকি তিনজন ঘাড় কাত করি ।

শামসুদ্দীন আবার হাঁটে । আমার আবার অনুসরন করি ।
একটা ভাংগা পাঁচিলের মতো । একটা ভাংগা দালানের কাঠামো ।টিমটিমে কুপির আলো । একটা শীর্ন হাত । নারী দেহের ছায়া ।
শামসুদ্দীন গলা খাঁকারী দেয় ।
ছায়া জিজ্ঞেস করে - 'কয়জন?'
আমরা নিঃশ্চুপ ।
তেলতেল মুখ বলে - 'চারজন'
ছায়ার দীর্ঘশ্বাস শুনি । ছায়া ফিস্ফিসিয়ে বলে-
'চারজনরে লাগাইতে দিলে, আগে আমার ভরপেট খাওন দেন '
তেলতেল মুখ হিসহিস করে- 'খাইয়া ল মাগী,আগে যে রান্না করলি রাখোস নাই কিছু? '
ছায়ার দীর্ঘশ্বাস আরো ধারালো শুনায়-
'না । বেবাক তো ডাকবাংলায় নিয়া গেলেন'

।৩।
রাত বোধ হয় ফুরোলো প্রায় ।
আবীর ঘুমোচ্ছে । ওর মুখে সুখী মানুষের ছায়া । ওর ঠোঁটের কোনে পাতলা হাসি । আবীর চৈতিকে ছিনিয়ে নেবে ।
বাথরুমে পানির শব্দ । নজু বোধহয় গোসল করছে কিংবা ওজু করবে । তাহাজ্জুদের ওয়াক্ত হয়ে গেছে মনে হয় ।
পার্থ বালিয়াড়ীতে চিৎ হয়ে জোছনা মাখছে । হয়তো কবিতা বুনছে। এই ছেলে চৈতীকে হারাবে ।

আমি বারান্দায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ।
কারো কারো দেখে যাওয়া ছাড়া আর কোনো ভূমিকাই থাকেনা ।

[২০০৬ কিংবা ২০০৭]

এক সন্ধ্যার প্রশ্নমালা

বহুদিন পর ঠিক এই জায়গাটাতে দাঁড়িয়ে আমি ।

আপাতঃ ঝক্ঝকে, বিত্তের ঝিলিক দেয়া আমার এই ক্লান্ত, মলিন, বিষন্ন শহরের এই হলো জিরো পয়েন্ট।
আচ্ছা জিরো পয়েন্ট মানে কি? এখান থেকে সবকিছুশুরু না এখানে এসে শেষ?
এটা কি নো ম্যানস লেন্ড?
কিন্তু এই বৃষ্টি মুখর সন্ধ্যায় আমি তো বেশ মানুষ দেখছি। দুপাওয়ালা মানুষ ।
নাকি ওরা কেউ মানুষ না, অথবা আমি নিজেই?কাফকার তেলাপোকা আমি, নাকি জীবনানন্দের দোয়েল ফড়িং, নাকি আমার মালটি ন্যাশনাল কোম্পানীর মালটিফর্মের চাকর?

যে পাশে দাঁড়িয়ে আছি তার উলটো পাশে তিনটে মেয়ে। তিনটেই মেয়ে। তিনটেই রমণযোগ্য। অতএব রমণী। নাকি মেয়ে মাত্রই রমণী?

হাত নেড়ে খুব ব্যাকুল হয়ে তিনজনই রিক্সা ডাকছে। কিন্তু একটা রিকশাওয়ালাও ঘুরে তাকাচ্ছে না। রিকশাওয়ালাগুলো এমোন নিরাসক্ত কেন? মেয়ে তিনটা তাদের রমণযোগ্য অথবা তারা মেয়েগুলোর নয় বলে?
একটা মোটর বাইকে তিনটা ছেলে। তিনটাই ঘুরে তাকাল। মেয়েগুলো তিন জোড়া চোখের লালসায় ধর্ষিত হলো।
ঠিক মাঝখানের মেয়েটার লম্বা গলার দিকে তাকিয়ে আমার আরেকটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস। ' লঘূ মরালীর মত মেয়েটিরে উড়িয়ে নেবে বিদেশী বাতাস'
এবার আমার চমকে উঠার পালা। কি আশ্চর্য্য, মাথার ফাঁক ফোঁকরে এখনো তাহলে দুএকটা লাইন রয়ে গেছে!

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে একটা গাড়ী এসে থামল। এই শহরে একটা বিদ্যালয় আছে, বিশ্ববিদ্যালয়। গাড়ীর পেট থেকে কয়েক ডজন বিদ্যার্থী নামলেন ।আমি যে রেষ্টুরেন্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওটাই 'তাহাদের' গন্তব্য । ওখানে বসে প্রেম হবে, শিক্ষা হবে, রাজনীতি আর অর্থনীতির হাতিঘোড়া হবে। ওদের দিকে তাকিয়ে আমি একপাল ছাগল দেখি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যার্থীগন আমলা হন। আমলাদের প্রিয় খাদ্য ঘুষ যেমন ছাগলের প্রিয় কাঁঠালপাতা।
আচ্ছা ছাগল এত কাঁঠালপাতা চিবোয় কেন?

রেষ্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে আমাকে পাশ কাটাল একজোড়া কপোত-কপোতী। দুজনের গায়েই এপ্রোন , সম্ভবত:হবু ডাক্তার । একটা প্রশ্নের উত্তর আমি মেলাতে পারি না কিছুতেই। কসাই হবার জন্য বোকা ছেলে মেয়েগুলো এত পড়ালেখা আর এত সময় নষ্ট করে কেন?

বৃষ্টি থামছে।
ফিরে যেতে হবে আমার আপন গুহায়।
ফুসফুসের খুব গভীরে টেনে নিয়ে যাই প্রিয় বেনসন হেজেজের একটান নিকোটিন।
ধোঁয়া ধোঁয়া নিকোটিন, ধোঁয়া ধোঁয়া প্রশ্ন ।
চমৎকার ব্লেন্ড হয়ে উড়ে যায় আকাশে, প্রিয় শুন্যতায় ।।


[২০০২ এ সম্ভবতঃ লেখা । একটা ছোটকাগজের জন্য , নাম ভুলে গেছি ]

ইউটপিক

(ঋণ স্বীকার: কবি আবুল হাসান, যার নাম থেকে ঝরে পড়ে সমুহ বিষাদ)

আজকাল আর কবিতা-টবিতা পড়া হয়না একেবারেই।
আমার দশফুট বাই দশফুট রূমের দেয়াল ঘেষে একটা কাঠের শেলফ। বেশ পুরনো। ঘুন ধরে গেছে। ওর গর্ভে নির্বিবাদ পড়ে আছে কটা কবিতার বই। অযত্ন অবহেলায় । বিগত যৌবনা রমণী যেন। (যৌবন শেষ হলে কে আর রমণ করে?)

এতগুলো বইয়ের এত্তোগুলো কবিতা এখন আর বাঁধে না আমাকে। তবে এখনো একটা... না পুরো কবিতাও না, একটা লাইন, স্রেফ একটা লাইন থেকে এখনো মুক্তি পাইনি আমি ।

ছোট খাট চাকুরী করি। বলার মত কিছু না। একা মানুষ। মাসের ৩০ দিন মাথা নীচু করে হাঁটি। মাস গেলে বেতন পাই। বেতন পেলে ছুটে যাই শহরের ভেতর এক পাড়ায়। ওখানে এক রমণী তার শরীরের ভিতর আমাকে আশ্রয় দেয়, সারা মাসের অশ্লীল কষ্ট নিয়ে উপগত হই। অবশ্য এ জন্য বিনিময় মূল্য দিতে হয়।
যা হোক কথা সেটা না।

কথা হল এক লাইন কবিতা। যখন পূর্ণ বেগে ধাবমান আমি, শুরু হয়ে গেছে পিচ্ছিল যাতায়াত.. হঠাৎ মাথার ভিতর বেজে উঠে ঐ লাইন। যেন মৃত্যু ঘোষণা। প্রবল আক্রোশে ফেটে পড়ি। কবিতার শরীর খুঁজি। না পেয়ে আঁকড়ে ধরি নারীর শরীর। পাশবিকতায় নারী তৃপ্ত হয়। যে কোন নারী। সেও। বিশ্রী ভাবে শ্বাস নেয়, প্রশ্বাস ফেলে। স্বভাবজাত কপটতায় বলে উঠে ’তুমি একটা পশু, এত জোরে কেউ...!’
পশুরও পাপ বোধ জেগে উঠে রমণ শেষে। পাপ দিয়ে পাপ মোছন করতে হয়। এক বোতল সস্তা হুইস্কি নিয়ে ঘরে ফিরি। আমার একলা ঘরে। তরল আগুন ঢালি গলায়... হাওয়া হাওয়া সুখ। উড়ে যাবার প্রস্তুতি নেই। এমন সময় আবার আঘাত হানে ঘাতক শব্দমালা :
’ আমাদের অন্তর্গত রক্তে খেলা করে বিপন্ন বিস্ময়’

এক লাইন জীবনানন্দ এভাবে আমাকে নিয়ে কেবলই খেলা করে। একদিন আমিও খেলনা থেকে হয়ে উঠি খেলোয়াড়। প্রত্যেকটা শব্দ ভাঙি, গড়ি, বিন্যাস করি। হঠাৎ করেই হয়ে যাই আর্কিমিডিস। ইউরেকা! পেয়ে যাই মর্মার্থ। বিপন্ন বিস্ময়-- এ বিস্ময় তো বস্তুত সেই সর্বনাশ! রক্তের ভিতরের সুন্দর সর্বনাশ! শ্রম দাসের বিক্ষত পিঠের মতো চিরন্তন । পৃথিবী যতবার খুশী ঘুরে আসুক সূর্যের চারপাশ, উজাড় হয়ে যাক আমাজানের গহীন জঙ্গল,আবিস্কার হোক দারিদ্র্য বিমোচনের অব্যথ দাওয়াই। ঘোষিত হোক ফরমান ’স্যানেটারী ন্যাপকিন ছাড়া আর কোথাও রক্তপাত হবে না’ ...যত কিছু হোক যত যা কিছু, মানুষের রক্তে তবু থেকে যাবে এ সর্বনাশ।

যেমন রয়ে গেছে তুমি, তোমার স্মৃতি ।
যখন আমি লুকোচুরি খেলছি পসরা রমণীর সাথে, বুঝতে দিচ্ছি না কি সুখ আমি লুট করে নিচ্ছি তার শরীর থেকে, তখন হঠাৎ তুমি এসে দাঁড়াও ঐ কবিতার মত। এক বিরাট ছন্দপতন। আঙুলের নখগুলো বড় হচ্ছে,তুমি এসে দাঁড়াও। মনে পড়ে যায় কেমন যত্ন করে তুমি আমার নখ কেটে দিতে। ছুটির দিনে একলা ঘরে বন্দী হয়ে থাকি। মনে পড়ে এরকম একা ঘরে তুমি একদিন আমার জন্য রেঁধেছিলে ।

আসলে মানুষ বড় দুর্ভাগা জীব। কুকুরের তবু ভাদ্রমাস আছে। পরের ভাদ্রে পুরনো সঙ্গীকে মনে রাখার কোন দায় থাকেনা তার। হায় মানুষের তেমন কোন ভাদ্র মাস নেই। ঐ সর্বনাশ বারমাসই তাকে মনে করিয়ে দেয় সব কিছু। বার বার।


মাঝে মাঝে তোমারও কি মনে পড়ে না? বেরুতে বেরোবে। সাথে তোমার স্বামী। বারান্দায় দাঁড়ানো নতুন মডেলের গাড়ী। সামনে কত আনন্দ, পার্টি, পাঁচতারা হোটেল। গাড়ীর আয়নায় চোখ পড়তেই কি সব এলোমেলো হয়ে যায় না? মনে পড়েনা এরকম নীল শাড়ী পড়লেই একজন বিমূর্ত বিস্ময়ে তোমাকে দেখত - ? আহ্ সেই একজন!

আসলে প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব কিছু জটিলতা থাকে। এই আমি কখনো মাকে তেমন ভালবাসতে পারিনি যেমন বাসে সবাই, বাবাকে আমার ঘৃণা করার কথা ছিল কিন্তু কেন যে শেষ পর্যন্ত করুনা করতে শুরু করলাম? আর কেনই যে মানুষ পরস্পরের কাছে উন্মুক্ত করে তাদের পাঁজরের দ্বার। আমরাও কেউ ভিন্ন নই।
কেমন নিস্পাপ সরলতায় এসে বলতে-- ’রাতে ঘুম হয়নি’। বোকা বোকা গর্ববোধ হত -’বোধ করি আমাকে ভেবে ভেবেই!’
পরে একসময় ফ্রয়েড পরে বোঝেছি তোমার তখনই পুরুষের প্রয়োজন ছিল,যেমন তেমন একখানা জ্যন্ত পুরুষ। আমি না হয়ে অন্য কেউ হলেও চলত। যেমন চলছে এখন। ’লিখতে এবং করতে আমার কোন ক্লান্তি নেই’। বলেছিল কবি আবুল হাসান। বেচারা! কোথায় এখন সুরাইয়া খানম।

এ সত্যটা এখন ভালই বুঝি কেউই যে অপরিহার্য নয় কারো জন্য। তবু রক্তের ঐ বিপন্নতা উলট পালট করে দেয় সবকিছু। সুখতাড়ানিয়া স্মৃতি, বোতল ভরা দহন আর জীবনানন্দ কবি- তিনজন মিলে হাজির করে ইন্সোমনিয়া, হ্যালুসিনেশন, ইউটোপিয়া...

এ জলা জংলার দেশ, মশা আর লোডশেডিংয়ের ডাস্টবিনটা হয়ে গেছে নন্দন কানন। চারদিকে সব উজ্জ্বল উচ্ছ্বল মানুষ। মঙ্গল গ্রহের রকেট ধরতে ছুটছে এক রঙ্গীন কিশোরী। পার্কে ছবি আঁকছেন পিকাসো, হোটেলে কবিতা পড়ছেন বোদলেয়ার আর রাজনীতি নিয়ে কথা বলছেন স্বয়ং সক্রেটিস। প্রতিটি দিনেই রয়েছে উজ্বল আলো আর মাতাল বাতাস এবং প্রত্যেক শহরের পাশেই একটা করে নিজস্ব সমুদ্র। এরকম একটা সমুদ্রের তীরেই আমি তোমাকে আবিস্কার করলাম আবার। তোমার পাশে অন্য কোন পুরুষ নেই। পরনে সেই নীল শাড়ী। কতদিন পর দেখা! কত বয়স হল তোমার? ষাট/সত্তুর/শত/হাজার বছর...? সময়ের নির্মমতা তবু স্পর্শ করেনি। তবু এক দ্রোপদ মনীষা নিজস্ব ভূগোলে। যেন সব প্রশ্নের উত্তর ওইখানে। তোমাকে স্পর্শ করিনা। কখনেই করিনি। বেলা ভূমিতে নতজানু হয়ে বসি।
শুধু বলি--’ তুমি ভালবাসা মানে বুঝো মেয়ে?/কোন গাণিতিক জটিলতায় তোমাকে বিক্রী হয়ে যেতে হয়?/ আর কেনই বা এই সব অবহেলা, দুঃস্বপ্ন ফিরে আসে বার বার? ’

তুমি কোন কথা বলো না। কেবল নিঃশব্দে হাসো। যেন ছেলেমানুষ আমি। অসহ্য লাগে, কে যেন আমাকে বলে দেয়
আসলে তুমিই আমার অন্তর্গত রক্তের সেই বিপন্ন বিস্ময়।

তোমার বিমূর্ত হাসি একটা দেয়াল গড়ে তুলছে। তোমাকে আড়াল করে ফেলছে ঐ দেয়াল। না আমি আর হারাতে চাই না। হাতের কাছে যা পাই ছুঁড়ে মারি ঐ দেয়ালে-অসহায় আমি।

কাঁচভাঙা আর্তনাদ গুমরে ফেরে আমার দশফুট বাই দশফুটে।
এই ভাবে প্রতিমাসে একবার রুটিনমত আমার নিজস্ব গুহায় সহবাস করি আমি, আমার স্মৃতি,স্বপ্ন, কষ্ট, ব্যর্থতা আর ভাঙা কাঁচের বোতল।


[ '৯৬ এ লেখা । আমাদে কাগজ 'সহবাস' এর প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল ]

Wednesday, July 16, 2008

তক্ষক

১।
আইপডটা কানে গুঁজে দেবো কিনা ভাবছি ।

নিতান্ত অভদ্রতা হয়ে যায়, কিন্তু কোনো বিকল্প খুঁজে পাচ্ছিনা । বয়স্ক ভদ্রলোক একটানা কথা বলে যাচ্ছেন ।
কথা বলা শুরু করেছেন অন্ততঃঘন্টা খানেক । আমি কিছুটা বিস্মিত ও হচ্ছি বটে । এই শীর্নশরীরের প্রায় বৃদ্ধ মানুষটা এতো কথা বলার শক্তি পাচ্ছেন কি করে?

যাচ্ছি ট্রেনে । এক জেলা শহরে চাকরীর ইন্টারভিউ দিতে । সুন্দর রোদেলা দিন । ট্রেনে ভীড় কম । জানালার পাশে বসেছি। পাশের সীট খালি ছিলো । চমৎকার বাতাস ।আইপডে লোপামুদ্রার গান । উপভোগ করছিলাম ।
প্রতীতির কথা মনে পড়ছিলো । পড়শু ডেটিং হলো আসিফের ফ্ল্যাটে । মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে । গল্প এখন শেষ পর্যায়ে । আমাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই,ছিলো ও না কোনোদিন । তবু হয়তো আমার মনে পড়বে প্রতীতিকে, প্রতীতির ও আমাকে মনে পড়বে কোনো অবসরে ।
প্রতিবার ডেটিংয়েই প্রতীতি আমাকে শরীর দেয় আর দেয় এক একটা চমৎকার কবিতার বই । ও মেয়ে নিজে কবিতা টবিতা পড়েনা কিন্তু আমাকে পড়ায় । সম্পর্ক হওয়ার আগে কোন একদিন বোধ করি ওকে জানিয়েছিলাম আমি, কবিতায় আমার প্রেমের কথা । আমার অনেক কিছুতেই পরে ও আর বিশ্বাস রাখেনি, কিন্তু এই অপ্রয়োজনীয় ব্যাপারটা মনে গেঁথে রেখেছে ।

ব্যাগ খুলে কবিতার বইটা বের করি । জয় গোস্বামীর কবিতা সংগ্রহ । আমি জয়ের কবিতার তেমন ভক্ত নেই । বড্ড বেশী লিরিক্যাল । তবু এই ছুটেচলা রোদেলা দুপুর, প্রায় নির্জন রেলের কামরা, হুহু বাতাস- আমি প্রতীতির প্রতি প্রেম ও কবিতার প্রতি কামবোধে আক্রান্ত হই ।

আইপড খুলে গলায় ঝুলিয়ে রাখি । বিশ্রাম নাও লোপামুদ্রা। ইতঃস্তত পাতা উল্টাই । বিন্যস্ত অক্ষর ও ছন্দের সমাবেশ । একটা পাতায় চোখ আটকায়ঃ

' একফোঁটা রক্ত শুধু ঝরে পড়ল,মাটি ফেটে গেলো আঘাতে?
শিশুদের মরামুখ ভেসে উঠল কি একবার?
তা কেউ দেখেনি,বড় মেঘ করে এসেছিল ।
নইলে দেখা যেত এই ফাঁকা
খেয়াঘাটে
চাঁদ চেপে ধরে আছে রক্তে ভেসে যাওয়া নাড়ী তার ।'

কেমন । কেমন যেনো লাইনগুলো ।অকারনে আমার গা কেঁপে উঠে ।

২।
-'দেখলেন ঘটনা । এইবার কিন্তু খেলা জমবো । সব চোর ধরা পড়তেছে'
ভদ্রলোক আবার কথা শুরু করেছেন ।
তার কোলের উপর কটকটে হলুদ রংয়ের খবরের কাগজ । এই আরেক আপদ শুরু হয়েছে আজকাল । ত্রানের টিন,রিলিফের কম্বল,ঘুষের টাকা,তেরশো নদী,ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল গিলে খেয়ে ধরা পড়ছে বন কর্মকর্তা,পুলিশের দ্বিতীয়কর্তা,রানীমাতার জৈষ্ঠ্য সন্তান । আর এইসব নিয়ে সিনেমা সিনেমা গল্প জুড়ে দেয়া চায়ের টেবিল থেকে ট্রেনের কামরা পর্যন্ত । বিরক্ত লাগে । যন্ত্রনাময় দিনকাল ।
-'আল্লাহর রহমত ছিলো, তাই দেশটা বেঁচে গেলো । আগামী ২০ বছর সেনাবাহিনীর ক্ষমতায় থাকা দরকার,কি বলেন?'

আমি মনে মনে গালি দেই । 'মর্ষকামী ভোদাই পাবলিক' । এই সব পাবলিকের কারনেই হাঁটুতে ঘিলুওয়ালারা ছড়ি ঘোরায় । যখন তখন রাস্তায় কানধরে উঠবস করাবে তবু পাবলিকের প্রীতি দূর হয়না ।
মুখে কিছু বলিনা । খামোখা কথা বাড়িয়ে লাভ নেই । আর দিনকাল আসলেই খুব সুবিধার না ।

ট্রেনের গতি কমে আসছে । প্লাটফর্মে ঢুকতে আর খুব দেরী নেই । ভদ্রলোক কোমর উঠানো শুরু করেছেন । এবার তার ব্যাগ গোছানো শুরু করবেন নিশ্চিত । ট্রেন থামার আগেই দরজায় গিয়ে ভীড় জমাবেন, সেটা ও নিশ্চিত প্রায় । মনে মনে আরেক প্রস্ত গালি দেই ।
-'তা বাবাজী এসে গেলাম প্রায় । অনেক কথা বললাম । কিছু মনে করেননি তো । আমারো একটা ছেলে আছে । আপনার বয়সীই হবে । না , আপনার চেয়ে আরেকটু বড়ো'
অর্থহীন কথা । আমি আতংকিত হই । নতুন কোন গল্প শুরু হয় বোঝি ।
-'তবে আমার ছেলেটা আপনার মতো নয়'
-আমার মতো নয়, মানে?

নিজের অজান্তেই এই প্রথম আমি তার কথার জবাব দেই ।
-আমার ছেলেটা পংগু । একটা মাত্র ছেলেই আমার
সর্বনাশ । লোকটা এখন পংগু ছেলের গল্প ফেঁদে সাহায্য না চাইলেই হয় ।পোষাক আষাকে ভদ্রলোক যদি ও । বিশ্বাস কি? যা দিনকাল পড়েছে । আমার আর কথা না বাড়ানোই নিরাপদ ।

তবু কি আশ্চর্য! আমিই পালটা প্রশ্ন করি । আমার কন্ঠ কি কিছুটা আর্দ্র?
-দুঃখিত । কি হয়েছিলো ওনার? কোন অসুখ,কোন দুর্ঘটনা?
-দুর্ঘটনা? হ্যাঁ । তা দুর্ঘটনা ও বলতে পারেন
কি এক অদ্ভুত কারনে আমার খুব আগ্রহ হচ্ছে এই বৃদ্ধের পংগু ছেলেটার কথা জানতে ।
-বলুন না প্লিজ? কি হয়েছিলো?
-১৯৯০ । মনে আছে বাবাজী? বয়স কতো তখন? ১০/১২? আমার ছেলেটা তখন ১৮ । কলেজে পড়ে । আন্দোলন করে । আর্মি পিটিয়ে ওর কোমরের হাড় আর দুপা ভেংগে দিয়েছিলো। বুট দিয়ে থেঁতলে দিয়েছিলো ওর পুরুষাংগ'

আমি বেদনার্ত হই । অন্ততঃ হওয়া উচিত । একজন বাবার মুখ ঝুলে পড়েছে তার একমাত্র পুত্রের পংগুত্বের গল্প বলতে গিয়ে ।
কিন্তু আমি বেদনার্ত হইনা । এই বকবকে বুড়ো একটু আগেই বলছিলেন এই দেশে যেনো আরো ২০ বছর সেনা শাসন থাকে । এই বুড়োকে আমি মনে মনে গালি দিয়েছিলাম 'মর্ষ্কামী ভোদাই' বলে ।আমার এবার তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে গালি দিতে ইচ্ছে করে
-আমি দুঃখিত । কিন্তু আপনিই আগে বললেন অন্ততঃ আরো ২০ বছর সেনাশাসন দরকার । অথচ আপনার ছেলে ওদের হাতেই । আসলে আপনাদের মতো মানুষদের জন্যই...'

ট্রেন প্লাটফর্মে ঢুকছে এবার । গতি প্রায় থেমে এসেছে । বৃদ্ধ তার ব্যাগ গুছিয়ে হাঁটা শুরু করে দিয়েছিলেন । ফিরলেন । ফিরে এলেন আমার কাছে । আমার চোখে চোখ রাখলেন । কেমন ঘোলাটে । গা শিউরে উঠে । গলা নামালেন । হিসসিস করে বললেন-
২০ নয়, ২০০ বছর ধরে আমি আর্মির শাসন চাই । প্রত্যেক মা-বাবার একটা করে ছেলে গুলী খেয়ে মরুক নয়তো পংগু হয়ে পড়ে থাক বিছানায়, আমার ছেলের মতো ।

বাইরে চমৎকার রোদ । তবু কেনো জানি সহসা তীব্র শীতের কাঁপুনি আমার সমস্ত জুড়ে। গন্তব্য পৌঁছে গেছি । উঠা দরকার । উঠতে পারছিনা । পারছিই না আর ।


[ সচলায়তনে প্রথম প্রকাশিত । সচলায়তন গল্প সংকলন এ মুদ্রিত ]

Thursday, July 10, 2008

আদমের ঘর-সন্ন্যাস

(এই গল্পটা দশবছর আগের লিখা । পাপড়ি রহমান ছাপিয়েছিলেন তার সাহিত্যকাগজ 'ধূলিচিত্র' এ । এইরকম লেখা এখন আর লিখিনা অথবা লিখতে পারিনা আর।
তবু তো এ আমারই লিখা , তুলে রাখলাম তাই নিজের ব্লগে ।)



ক’দিন থেকেই এমন হচ্ছে।
ঘুম ভাঙতেই প্রচন্ড তৃষ্ণা পাচ্ছে, অথবা তৃষ্ণা পেয়েই ঘুম ভাঙছে ।
বিছানা থেকে প্রায় গড়িয়ে নামে হাসান। দেয়াল ঘড়িতে চোখ যায় দ্রুত। সকাল নটা বেজে কুড়ি। দরজার ছিটকিনি ভেতর থেকে নামানো। তার মানে ঘুম না ভাঙিয়েই রজব আলী চলে গেছে।
রজব আলী বাড়ি গেছে। রজব আলী বাড়ি যাচ্ছে মেঘনার বুকে ভেসে। আহ্ মেঘনা!
চোখের সামনে নদীটা ভাসতেই হাসানের মনে পড়ল বিছানা থেকে নেমেছে সে গলা ভেজানোর জন্য। টেবিলের ওপর রাখা জগটা উপুড় করে ধরল গলায়। এক সেকেন্ড... দু সেকেন্ড.. পানির ফোঁটা পড়ল না। প্রায় দৌড়ে এবার বেসিনের ট্যাপ ঘোরাল। নেই! ..হ্যালো ওয়াসা পানি নেই, ...মিষ্টার মেয়র আমার পানি নেই, ...জাতির ত্রাতাগন আমার জন্য একফোঁটা পানি নেই...।

হাসানের তৃষ্ণা বাড়তে থাকে। আর তৃষ্ণা মাত্রই তো বর্ধনশীল। একবার পেলে কেবল বাড়তেই থাকে। আকাশ-পাতাল দৈর্ঘ্যের তৃষ্ণা বুকে পায়চারি করতে করতে হাসান হঠাৎ লাথি বসাল শূন্য জগে। জগটা শূন্যে ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে পড়ল ঘরের এক কোণে, সেখানে এক মানুষ সমান দৈর্ঘ্যের আয়না বসানো। আয়নাটা বড় শখের ওর।
শখের আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল হাসান।

আয়নার ভেতরে এক জীবন্ত স্লাইড। ওর চোখে চোখ রাখল সে। চোখ দুটো ক্রমশ তীক্ষন এবং দৃষ্টি কঠোর হয়ে যাচ্ছে। চোখের মণি আজকাল জ্বলজ্বল করে জ্বলে। আজকাল নিজেকে বেশ সু-পুরুষ মনে হয়। আগের সেই নরম নরম চেহারাটা ভেঙে কেমন যেন ধারালো হয়ে উঠছে। তবে বেশ শীর্ণ ও । শরীরে এক ফোঁটা মেদ নেই। এ নিয়ে অবশ্য কোনো দুঃখবোধও নেই ওর, হাসান ভেতরে আগুন ধারণ করে আর আগুন মাত্রই পোড়ায় সমস্ত মেদ, যাবতীয় বৈভব।

আয়নার ভেতরে স্লাইড বদলায়।
ঠোঁট টিপে নিঃশব্দে হেসে ওঠে এক কিশোরী। চৈতী এমন করেই তো হাসত। ওই হাসি আধ বোঁজা চোখ, ঠোঁটের ভাঁজ- এসব নিয়েই তো হাসানের প্রথম কৈশোর। যেমন সবারই থাকে। আসলে কমবেশি সব মানুষের গল্প তো সেই একই রকম। তবু কেন যে মানুষের এত মৌলিকত্বের, এত অনন্যতার আবদার। চৈতীর মেয়ে নাকি এখন স্কুলে যায়। সেই চৈতী, স্পর্শের আগেই যে কেঁপে উঠত। চৈতীর মেয়ে এখন স্কুলে যায়! হাসানের ভাবনায় চৈতী এখনো তবু সেই বেণী দোলানো কোমল কিশোরী । হাসান কথা বলে ওর সাথে
-চৈতী!
-উঁ!
-ফিরিয়ে দাও।
- কী?
- আমার কৈশোর।
- কী?
- তোমার দোলন চাঁপা।
- কী?
- তোমাকে দেয়া আমার আবেগের সমস্ত অনুবাদ
- কী?
- কিছু না। কিছু না গো মেয়ে। কিছু না!

হাসান ওকে ক্ষমা করে দেয়।

সাথে সাথে স্লাইড বদলায়।
এবার এক উচ্ছ্বল তরুণী। ঝলমলে একুশ বছর। প্রানোচ্ছল প্রতীতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের রোদ্দুর মাখা দিনগুলোর বেহিসেবী অংশীদার। প্রতীতির সাথে কাটানো ওই দিনগুলোতে সে বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে পারত। তখন ঘননীল হয়ে যেত আকাশ, বাতাসের গভীরে আরো স্নিগ্ধ হয়ে বইত বাতাস, কচি সবুজ ঘাসে ঢেকে যেত আদিগন্ত পৃথিবী। প্রতীতি যেন তখন এক লঘূ মরালী। হাতছানি দিয়ে হাসানকেও ডাকত ডানা মেলে একসাথে উড়বার জন্য। হাসান ওড়েনি তখন। তবে ডান ঝাপটিয়েছে। ডানা ঝাপটানোর শব্দে বুঝাতে চেয়েছে- ‘উড়তে আমি পারি। কিন্তু উড়ব আমার ইচ্ছেয়। কেবল আমার ইচ্ছেতেই’। প্রতীতি প্রতীক্ষা করতে চেয়েছিল, প্রতীক্ষা করেছিল ওর ইচ্ছের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন জানি ইচ্ছেটাই জাগেনি আর। আসলে ওসব ভালো লাগে না ওর, অন্ততঃ ভালো লাগত না তখন, জীবনটা যখন আরো বছর কয়েকের সজীব ছিল।
তখন মনে হতো প্রত্যেকটা মানুষ একেকটা নদীর মতো যে যার নিয়মে বয়ে যায়, কেউ কারো জন্য প্রতীক্ষায় থাকে না, থাকতে পারে না।হ্যাঁ হয়, কারো জন্য কারো হয়ে যায়। যেমন সমুদ্রে যেতে যেতে মোহনায় কোনো নদীর দেখা হয়ে যায় অন্য কোন নদীর সাথে। কিন্তু এ তো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা মাত্র এতে কারোরই কোনো কৃতিত্ব থাকে না।

তবে সাতাশ বছরের চৌকাঠ দাঁড়িয়ে ওসব একুশে দর্শনে ফাটল ধরেছে হাসানের। আজকাল মনে হয় -হয়তো পারে মানুষ, হয়তো ইচ্ছেটাকে আরো শানিত করতে পারলে । মানুষ হয়তো কিছুটা নদীর মতনই, কিন্তু নদী তো আর না। এসব ভাবনা শিরদাঁড়া হয়ে চিন্তায় প্রবেশ করতেই হাসান কথা শুরু করে আয়নার ভেতরের একুশ বছরের সাথে
-তোমাকে খুব মনে পড়ে প্রতীতি।
- মিথ্যে!
- সেই ১৩ নভেম্বর, ফরেষ্টহিল, ক্যাডবেরী চকলেট... সব মনে পড়ে।
-মিথ্যে!
-তোমাকে এখনো ভালোবাসি।
-মিথ্যে
- হ্যাঁ মিথ্যে । আমি কাউকে ভালোবাসি না, বাসিনি কোনোদিন। আমাকে নির্বাণ করে, এত জল ধারণ করে না কোনো সরোবর।

আয়নার ভেতরে প্রতীতির ছায়া ম্লান হয়ে যায়। হাসানের হঠাৎ জেগে ওঠা পুরনো অহং প্রতীতিকে মুছে দেয় সহজেই।

প্রতীতির বদলে এবার নতুন স্লাইড। আয়নার ভেতরে ঝলসে ওঠে টান টান যৌবন। মাংসল উদ্দামতা, লিপষ্টিকের হাতছানি।রক্তে বানডাকা সুগন্ধী... এবং উর্মিলা চৌধুরী। হাসান যে কোম্পানীতে কম্পিউটার অপারেটরের চাকরি করে মেয়েটা সেখানে শোভাবর্ধন করে। ভালো মাইনে পায় সে এবং ভারীক্কী একটা পদবিও আছে তার। ‘পি.আর.ও-পাবলিক রিলেশনস অফিসার’। হাসান অবশ্য বলে ‘বি.আর.ও-বায়ার রিক্রেশনস অফিসার’। সাদা চামড়ার, ভুঁড়িওয়ালা, চান্দিছিলা, যত বায়ার আসে সকলের রিক্রেশনের জন্যএই উর্মিলা চৌধুরী। সে যত আনন্দ বিলায় চেহারায় তত তার ঝিলিক বাড়ে, শরীরে তত বেশি আবেদন জাগে।

মাঝে মাঝে কম্পিউটার রুমে আসে সে এটা-ওটা প্রিন্ট করতে। যখন ফিরে যায়, আজন্ম তৃষ্ণা নিয়ে হাসান তাকিয়ে থাকে তার গমনে। এই উথাল-পাতাল আলোড়নে শরীরের ভেতর ভীষণ রকম জল ভাঙে। শরীর আজকাল ওকে খুব অসহায় করে ফেলে অথচ প্রতীতিকে বুকে জড়িয়ে রেখে ও কেমন শান্ত, স্নিগ্ধ, নির্মোহ হয়ে থাকতে পারত ও একুশ বছর বয়সে। সেই পবিত্র একুশে!
একুশ বছরকে মনে রেখে হাসান এবার চোখ তোলে আয়নার ভেতরে উর্মিলার আগ্রাসী ইমেজে

-খুব কি সুখ পাও মেয়ে, এই সবে?
-জানি না!
-কষ্ট কি পাও না কখনো?
- জানি না!
- স্নানের জলে হাত ডোবালে মাঝে মাঝে কান্না পায় না?
-জানি না!
আসলেই জানো না। আমিও তো জানি যে এসব জানো না তুমি, তোমরা কেউ। বাম পাঁজরের অন্তর্দহন, অনুভূতির বিবসন এসব তোমাদের জন্য নয়। পৃথিবীর সমস্ত বিষের বালি, নীল বুদবুদ কেবল আমাদেরই... কেবলই আমার।



[২]

ঘর থেকে যখন বেরোল হাসান, ছায়া তখন ঠিক পায়ের কাছে।
সূর্য জ্বলছে মাথার ওপর । সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকেই বুঝতে পারছে আজ আবার মাথার ভেতর ক্ষ্যাপামী শুরু হয়েছে- অনেক দিন পর। বয়স যখন আরো কম ছিল, পৃথিবীকে যখন আরো স্বপ্নময় মনে হতো, মনে হতো সব ‘সম্ভব-না’ গুলো ঠিক ঠিক একদিন ‘সম্ভাবনা’ হয়ে উঠবে- ওই রকম সবুজ সময়ে এসব ক্ষ্যাপামী প্রায়ই জড়িয়ে ধরত ওকে।
তুমূল আড্ডা, জোরালো যুক্তিতর্ক, হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি, শেয়ারবাজার, শমী কায়সার, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি... এরই মাঝখান থেকে সে হঠাৎ উধাও। গনগনে দুপুরে একা একা হেঁটেছে শহরের সমস্ত পথজুড়ে। কোনোদিন প্রতীতিকে নিয়ে সারাদিন টই টই, শহর ছাড়িয়ে দূরে কোথাও। ক্যাডবেরী চকলেটে কামড় বসিয়ে বলেছে- ‘দেখিস ক্যাডবেরী কোম্পানি যেদিন উঠে যাবে সেদিনও আমার দাঁতের কামড় রয়ে যাবে। যেদিন তুই অনেক দূরে চলে যাবি, সেদিনও তোর ভেতরে আমি রয়ে যাব।’ অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার আগের রাতে ছাদের ওপর গাঁজার আসর। ‘ধ্যাত ভাল্লাগছে না!’ বলে কমন প্রশ্ন ছেড়ে আসা এসব একজনকেই মানাত। কিন্তু সেই হাসান পৃথিবীতে নেই আজ, ক্ষ্যাপাটে পাগলামির ওই শহরটাও নেই, নেই সংগীসাথীরা কেউ।

যেন স্বর্গের বাগান থেকে নির্বাসিত আদিম পুরুষ সে। নিজেকে জেনে ফেলার অপরাধে বন্দী এখন এই ইট-কাঠ- পাথরের নোংরা নগরে। সপ্তাহে ছয়দিন কেটে যায় কি-বোর্ড, মাউস,প্রিন্টারে। প্রত্যেক ছুটির দিনে রুমমেট রজব আলী বাড়ি ছোটে তার আদরের টুনটুনি বৌ-র টানে। হাসানের কোথাও যাওয়া হয় না। এই একদিন সে ঘুমোয় নয়তো অমুক-তমুক চ্যানেলে রকমারি নাচ দেখে মাঝে মাঝে বাথরুমে যায়, শরীরটাকে একটু হালকা করে নেয়। চাকরিতে ঢোকার দুবছর থেকে এই হলো তার মোটামুটি জীবন যাপন। খারাপ কী, ভালোই তো যাচ্ছিল, কেন যে আজ আবার সেই পুরনো ক্ষরণ, রক্তের উন্মাদনা, ডাকপিয়নের হলুদ চিঠি। পাশ দিয়ে যন্ত্রদানব ছুটে যাচ্ছে। কালো ধোঁয়ার উৎপাত। জ্যাম, জট, মঘা ইউনানীর লিফলেট, গোপন অসুখের প্রকাশ্য ক্যানভাস, রিকশাওয়ালার ঝগড়া, গাড়িওয়ালার গালাগালি, ট্রাফিকের অসহায় বাঁশী- কিচ্ছু যায়-আসে না, আজ কিচ্ছু যায়-আসে না হাসানের।

পুরনো গুহায় ঢুকেছে সে আজ। শরীর থেকে খুলে ফেলেছে গজিয়ে ওঠা সামান্য আগাছা । সে জানে এর কোনো মানে নই। ‘কিসের কী মানে আছে হে?’ যা কিছুর মানে নেই তার মানেই খুঁজে বের করো’- কে যেন বলেছিল কথাটা। পৃথিবী জুড়ে এত কথা, যায় কোথায় এত কথা? মানুষের সমস্ত কথা নাকি ছড়িয়ে পড়ে ইথারে। ওখানে থেকে ফিরিয়ে আনা যায় না? যদি আনা যেত তাহলে ওকে দেয়া সবার সব কথা সে ফিরিয়ে দিত। ‘আমাকে এত কথা দেয়া কেন? আমি তো কাউকে কোনো কথা দেইনি কোনোদিন। আজন্ম সার্বভৌম আমি, কারো কাছে আমার কোনো দায় নেই। ঈশরের মতো নিঃসংগ ও অপরিবর্তনীয় আমি। যখন অনেক বন্ধু ছিল আমার, চৈতী ছিল, প্রতীতি ছিল, উর্মিলা আছে, যখন অমুক-তমুক থাকবে তখনো ঠিক এ রকমই রয়ে যাব আমি। কেউই কোনোদিন স্পর্শ করতে পারেনি, কোনো কিছুই বদলাতে পারেনি খুব গহীনের একান্ত আমাকে। বদলাতে পারেনি বলেই অর্থহীন ঘুরে বেড়াতে পারি এখনো, ঘুরে বেড়াতে পারি কোনো ধান্দা ছাড়াই।’

এই সব ক্ষ্যাপাটে স্বমেহন (!) হাসানকে টেনে নিয়ে যায় কালো পিচের রাস্তা ধরে। গনগনে রোদ মাথার ওপরে। পায়ের কাছে খাড়া ছায়া। বাম হাতে ওর ঘড়ি প্যাঁচানো আছে। আজ সারা বেলা অনন্ত ছুটি। ঘড়ি তো কেবলই বাহুল্য । বাহুল্য দ্বি-প্রহরের ক্ষুধা-তৃষ্ণা।
একটা বাহারী পোষ্টারে চোখে পড়ে ওর। প্রিয়ংবদা প্রিয়দর্শিনীর চিত্রপ্রদর্শনী, ‘প্রিয়ংবদা প্রিয়দর্শিনী’! বড়ই রঙিন নাম। দর্শনে প্রিয় না হলে কি আর বাজার মাত হয়?
পোষ্টারে আবার উদ্বোধকের নামটাও বড় করে ছাপা । নামটা পরিচিত নয়। হবে হয়তো কোন কুটনীতিক, মন্ত্রী কিংবা শিল্পপতি। ‘শিল্পী আর শিল্পপতি’ – বড় চমৎকার সহবাস হচ্ছে আজকাল। হবে না-ই বা কেন? পতিরাই তো ভোগ করবে শিল্প আর শিল্পীর শরীর।

হাসানের মনে পড়ে যায় এক সময় সেও লিখত। কবিতা- ভালোবাসাএবং দ্রোহের । তারপর এল গল্প- ছোট, বড়, মাঝারী। ‘আবার শুরু করলে কেমন হয়?’ মনে মনে ভাবে সে। অনেক দিন থেকেই ওর একটা গল্প লেখার ইচ্ছে। এক পথিকের গল্প। পথ চলতে চলতে সে পথিক পাথর কুড়োত। লাল পাথর, নীল পাথর, কাঁচা হলুদ রঙের পাথর, মাঠের ঘাসের সবুজপাথর। কুড়োনো পাথরে ভর্তি হলো তার জামার পকেট, কাঁধের ঝোলা। এরপর দুহাত, তারপর? তারপর পথিকের উদ্ভ্রান্ত সময়। সামনে এখনো অনেক ভালোলাগা পাথর, কিন্তু তার যে আর ঠাঁই নেই।

গল্পটা শুনতে গিয়ে ফিক্ করে হেসে ফেলে হাসানের ছায়া
-হবে না হে! তোমাকে দিয়ে গল্প-টল্প হবে না।
-কেন, হবে না কেন? আমি তো মিথ্যে লিখবো না, ওই পথিক তো চেনা আমার।
-তবু হবে না, তোমাকে লিখতে হবে টক-ঝাল-মিষ্টি, বালিকা প্রিয় প্যাকেট সাইজ গল্প, তবেই হবে।
- কী হবে?
-নগরে সুরম্য প্রাসাদ হবে, আকাশ চ্যানেলে তোমার গল্পের নাট্যরূপ হবে, সাজানো-গোছানো শিল্পকন্যাগণ তোমার সাথে লং ড্রাইভে যাবে দামি গাড়িতে চড়ে।
-কিন্তু সেই পথিক, তার কী হবে?
-সে তোমার গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মরবে !


[ ৩ ]

উদ্যানে এখনো ছিটে-ফোঁটা বৃক্ষ আছে। বৃক্ষের শরীর কেটে বানানো বেঞ্চে হাত-পা ছড়িয়ে বসে হাসান। চাঁদ উঠছি উঠছি করে উঠছে না কেন জানি ।
আর, সে আসে। নিজস্ব ভথিতে। যেমন করে আসে তারা।

-‘নিবেন?’
একা ঘর। রজব আলী ছুটে গেছে তার টুনটুনি বৌ-এর কাছে। চৈতী, প্রতীতি প্রত্যেকে নিজেদের ঠিকানায়, উর্মিলা উত্তাপ ছড়াচ্ছে কোনো দামি রেস্তোরাঁয়।
হাসান কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? পকেটে হাত দেয়। টাকা আছে। ওটা থাকলে সবই তো হয়।
যে কাউকেই নেয়া যায় ইচ্ছে মতন। আর নেয়া মানে তো যাওয়াই । যাওয়া এবং আসা, যাওয়া-আসা। যাতায়াত, পিচ্ছিল যাতায়াত।
-সারারাত। কত নিবা?
-কয়জন?
-একা।
-দিয়েন!

হাসান একটি রিক্সা নেয়। চাঁদ উঠেছে। ঝিরঝির বাতাস। মেয়েটা ওর বাম পাশে। হাসান কখনো মেয়েদের বামে বসে না। মেয়েটার চুল একটু একটু করে বাতাসে উড়ছে। ভাললাগছে। ভীষণ ভালথাগছে। মনে হচ্ছে এই তো সবুজ সন্ন্যাস। এই তো গৃহ স্বর্গের বাগান। মাটির মোহর।
‘ কী নাম তোমার গো মেয়ে? চৈতী, প্রতীতি নাকি পপি, শাবনূর?’ নাম একটা হলেই হয়, না হলেই বা কী হয়। হাওয়ার নাম কে রেখেছিল? আদম! আদমের নাম? ঈশ্বর! ঈশরের নাম? মানুষ।
আমি মানুষ। আমরা মানুষ। আমাদের আর কোনো নাম নেই। নেই ভিন্ন অতীত। আমি আদিম পুরুষ। তুমি বিবি হাওয়া। আজ সারা রাত আমরা বিভোর হবো গন্ধমের নেশায়। আমরা সৃষ্টি করব প্রাণ। আমাদের সন্তানেরা মগ্ন থাকবে কৃষির সারল্যে। চিনবে না তারা শিকারের উন্মাদনা, হবে না তারা সভ্যতার সচ্ছল শিকার।

তিন চাকার স্বপ্নযান ছুটে চলে গৃহে,সন্ন্যাসে ।।

Monday, September 25, 2006

একটি কল্পদৃশ্য অথবা নিছক মৃত্যু

”...এসব জটিলতাই ঘূণ পোকা আমার।... মানুষ হিসেবে জম্ম নিয়ে মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে না পারার কষ্ট যে কি ভীষণ! কেন যে আমার কিছুই ভালো লাগে না! না নারী, না কাব্য, না চকচমকে ক্যারিয়ার... কিচ্ছু না! স্বপ্ন আর বাস্তবতার অসহ্য বৈপরীত্য আমাকে ভাঙে। কেবলই... নিজের ভেতর...”

ডায়েরির পাতা জুড়ে এভাবেই একজন সাজিয়েছিল নিজেকে এলোমেলো । এখন নেই।
লাশ হয়ে গেছে কাল রাতে। সাদা কাফনে মুড়ে শুইয়ে রাখা হয়েছে সামনের উঠোনে। কালো গেট ঠেলে আসছে অনেকেই। জানা- অজানা, চেনা-অচেনা।

কে মন্ত্রণা দিয়েছিল ওকে এই সর্বনাশের? জীবনানন্দ না কায়েস আহমেদ, নাকি মায়াকোভস্কি-আত্নহননের নিপুণ শিল্পী? ২১টা সোনেরিল মুখে দেবার সময় করো কথা বুঝি মনে পড়েনি! মনে পড়েনি মাকে? যিনি ঈশ্বর ছিলেন ওর কাছে! অথবা আমাদের কাউকে? যারা বন্ধু ছিলাম...!

লাশটাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদছে অপালা, ক্লাসের সবথেকে শান্ত মেয়েটা। এই লাশ একদিন অপালাকে বলতে চেয়েছিল ’--- তুমি কি আমার জন্য প্রতীক্ষা করবে? ’ কেন জানি বলা হয়নি। অথবা কি বলা হয়েছিল? নারী অধিকার নিয়ে ভীষণ সোচ্চার লীনা। খুব খুনসুঁটি হতো এসব নিয়ে। নয়নের কাঁধে মাথা রেখে লীনা এখন কাঁদছে। আর প্রতীতি! সবচেয়ে উচ্ছল মেয়েটা নির্বাক বসে আছে মুখ ঢেকে। ওর বুঝি সেই চিঠিটার কথা মনে পড়ছে যেখানে এই লাশ একদিন লিখেছিল ’---তুই আমার ওয়েসিস হবি? ভীষণ ক্লান্ত আমি। একটু ছায়া দিবি আমাকে? '

এসব একান্ত কিছু যে জানা ছিল আমার।প্রথম যেদিন বিতর্ক আর আবৃত্তি দিয়ে কাঁপিয়েছিল কলেজ অডিটরিয়াম- পাশে ছিলাম, প্রথম যেদিন গাঁজা খেয়ে চিৎকার করেছিল- ’নষ্ট হয়ে গেলাম!’ .. পাশে ছিলাম । প্রথম যেদিন একটু ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছিল প্রতীতিকে, সেই নিজস্ব দিনেও তো পাশে ছিলাম।

আর আজ প্রথম যখন লাশ হয়ে গেলো, প্রথম যখন প্রবেশ করবে অনন্ত অন্ধকারে, তখন কি পাশে থাকবো না আমি?
আমার যে ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে ওই আত্নঘাতী কষ্টের স্বরূপ। নাকি এ কষ্ট অচেনা ছিল তার নিজের কাছেই? ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সব দেখি। লাশটাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গোসল দিতে। অন্তর্গত রক্তে আমার বিপন্ন ক্লান্তি। ঘুমোতে ইচ্ছে করে। ভীষণ। অনন্ত নিদ্রা। তন্দ্রার ভেতর আমাকে হাতছানি দেয় ২১টা সোনেরিল।


[ সম্ভবতঃ ১৯৯৬ এর কোন একদিন লেখা]

Saturday, July 22, 2006

শূন্যকড়চা

'দ্যাজ ইট্‌ । তোর কোন প্রব্লেম নেই আসলে '
যেনো রায় ঘোষনা করলো অরুনা ।
মেয়েটা আজকাল চশমা পড়ছে । আমি চোখ তুলে ওর চোখে চোখ রাখতে চাইলাম।
না! কেবল দৃষ্টি বিনিময়। ওর দৃষ্টিতে সবকিছু বোঝে ফেলার এক প্রবল আত্নবিশ্বাস।

আমি ঠোঁটের কোনে সেই বাঁকা হাসিটা ফোটাতে চাইলাম । বছর কয়েক আগে এই হাসি বিভ্রান্ত করতো কাউকে কাউকে। অরুনা কি ছিল তাদের একজন?
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম । রিলাক্স মুডে ।
'আমার তাহলে কোনো প্রব্লেম নেই । দ্যাজ গুড-'
--' নো, দ্যাজ নো গুড । দ্যাজ দ্যা রিয়েল প্রব্লেম ইনফ্যাক্ট। ডাক্তার বলছে তুই ম্যান্টালি,ফিসিক্যালি একদম ফিট । বাট ইচ্ছে করে কিছু সমস্যা তৈরি করছিস । ভয়াবহ সব সমস্যা । কিন্তু তুই পাগল ও না, ড্রাগ এডিক্ট ও না'
অরুনার কপালে ভাঁজ । আমি ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এ সস্‌ মাখাই।
বাইরে মৃত আলো । শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেঁস্তোরায় গুমোট সময়।
ওর হাত আমার হাত স্পর্শ করে। বন্ধুর হাত । একসময় পালকের মতো প্রীতিময় ছিলো । আজ কেনো জানি বেশ ভারী মনে হয়।
--' তোর মতো ছেলের এসব পাগলামী মানায়না । যা হবার হয়ে গেছে । ইউ হেভ টু রিভাইভ । খালাম্মা ভীষন কষ্ট পাচ্ছেন'
মেয়েটাকে এবার আমার অসহ্য লাগে ।

এই মেয়েটা, আমি-আমরা ক'জন বিশ্ববিদ্যালয়ের বছর গুলোতে বুনো হাঁসের পালকের মতো সন্নিহিত ছিলাম । হায় পাখী উড়ে যায় ! ছায়া যায়! এক সময় পড়ে থাকা পালক ও হারিয়ে যায় ।
অরুনা ইংল্যান্ড গিয়েছিল এম,বি,এ করতে । ফিরে এসে মাষ্টারি করছে একটা বেসরকারি(বেদরকারি!) বিশ্ববিদ্যালয়ে।
মাঝে মাঝে তবু শরীর ফিরে আসে । সময় ফেরেনা কখনোই।
তবু বহুদিন পর আমি আর অরুনা আবার।
--' আমি লন্ডন থেকে ব্যাক করার আগে চৈতির বাসায় গিয়েছিলাম । জানিস তো মনে হয় ওর একটা ছেলে হয়েছে।
কি ভীষন কিউট একটা ছেলে '
মেয়েটা আমাকে স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছে । বেশ চালাক হয়ে গেছে দেখছি।
--' আচ্ছা চৈতির সাথে তোর সমস্যাটা কি হয়েছিল বলতো? এতো বছর প্রেম করে বিয়ে করলি অথচ বছর পেরোবার আগেই
সেপারেশন! ও তবু আবার বিয়ে করলো, লন্ডন গেলো আর তুই? চাকরী বাকরী সব ছেড়ে দিলি । আমি ওকে ও জিজ্ঞেস
করেছিলাম। কিচ্ছু বললোনা । আর তুই তো আমার একটা মেইলের ও রিপ্লাই দিলিনা'
আমি মুরগির ভাজা ঠ্যাং এ কামড় দেই।
অরুনা আমার হাতে চিমটি কাটে
--'কিরে কথা বলিস্ না কেনো?'

আমার ইচ্ছে করেনা । না অরুনা, না অন্য কারো সাথে । আমার যত শব্দ বুনন এখন কেবলি নিজের সাথে।
'চৈতির সাথে সত্যি কি কোনো সমস্যা হয়েছিলো আমার? ও তো ভীষন ভালো একটা মেয়ে । বিছানায় এবং ভালোবাসায় । তবু কেনো যে একদিন আমার মনে হলো-- এই তবে ঘর সংসার,বিয়ে ভালোবাসা! কেমন একঘেঁয়ে অর্থহীন সম্পর্কের জটিলতা । অপ্রয়োজনীয় সন্তান উৎপাদন। পৃথিবীর প্রতিটি নারী-পুরুষ তো আর কবিতা লেখেনা,মাঝরাতে বাঁধ ভেংগে গেলে সবাই তো আর প্রতিরোধে আসেনা, প্রত্যেকে তো আর ভালোবেসে জল ঢালেনা বৃক্ষের শিকড়ে । তাহলে প্রতিটি নারী-পুরুষের কি প্রয়োজন জনক জননী হবার?'

আমার নৈঃশব্দে অরুনা বিরক্ত হয় । অরুনা বেদনার্ত হয় আমার জন্য । অরুনা উপহাস করে আমাকে
--'তুই যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকিস কারো সাথে কিছু শেয়ার করবিনা, এ রকম মৌন হয়ে থাকবি তাহলে পাহাড় জংগলে চলে যা । গৌতম বুদ্ধ হয়ে বসে বসে ধ্যান করগে, যা '

হা হা হা । আমার হাসি পায়। অরুনার বিরক্তিতে আমার ভীষন হাসি পায় । হাসতে হাসতে আমি আমার নৈঃশব্দের ভাষায় ওকে বলি-
' অরুনারে কতো বুদ্ধ, কতো মুহম্মদ, কতো যীশু এলেন গেলেন । সমুহ বিপন্নতা থেকে তবু মানুষের পরিত্রান হলো কই? কতো দর্শন,কতো ধর্ম,কতো তন্ত্র তবু হত্যা,তবু ধবংস তবু হাহাকার'

রেঁস্তোরা ফাঁকা ছিলো এতক্ষন । হইহই করে এসে ঢোকলো একদল রংগিন ছেলে মেয়ে । ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসলো অনেকটুকু জায়গা নিয়ে । এরা বেঁচে আছে এখনো । আছে অর্থহিন বন্ধুতা ও ভালোবাসায় । আছে ক্লান্তিকর প্রেমে ও যৌনতায়।

আমি তবু ঝরাপাতার কান্না শুনি । যেনো হাঁটছি এক প্রান্তহীন শালবনের ভেতর দিয়ে। চরাচরে গভীর শুন্যতা । প্রান্ত্র জুড়ে অগনন ঝরা পাতা । ঝরছে আরো অবিরাম। আমি ইতঃস্তত হাঁটছি । পায়ের নীচে পাতা ভাংগছে।
স্মৃতি কাঁদছে। আমি ভাবলেশহীন।
কফির ধোঁয়া উড়ছে।

মুখোমুখি গন্তব্যহীন আমি ও অরুনা ।